বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে শেষ বিদায় জানিয়েছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ১১টায় নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তাকে মিরসরাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে বাদ আসর ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে দ্বিতীয় নামাজের জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
এর আগে সকালে তার মরদেহ জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হয়। সাবেক এই মন্ত্রীর জানাজাকে কেন্দ্র করে জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদ এলাকায় জোরদার করা হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। জানাজায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের হাজারো মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন দেশের রাজনীতির এক অভিজ্ঞ ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ভূমিকা মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। এসময় তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
এসময় আরও বক্তব্য দেন সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, সিপিবির সাবেক সভাপতি শাহ আলম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
পরিবারের পক্ষে মোশাররফ হোসেনের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান তার বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। তার বাবার আচরণে কেউ কষ্ট পেলে এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, আজ আমাদের অনেক কষ্টের দিন। বাবা অনেক দিন হাসপাতালে ছিলেন। বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছি। সব ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে জনতাকে সংগঠিত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজ প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এতে পাকিস্তানি সেনাদের এই মহাসড়ক যোগাযোগ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ মেজর জিয়াউর রহমানের অধীন এক নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জিতে প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী মোশাররফ হোসেন। স্বাধীন দেশে তিনি আরও ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দুই দফায় মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী- এ তিনজনকে বলা হতো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির তিন কর্ণধার বা ‘ট্রায়ো’।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধ, সবখানেই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা ছিলেন।
১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মোশাররফ ষাটের দশকে পাকিস্তানের লাহোর থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেন। প্রথাগত ছাত্র রাজনীতি না করেও সত্তরের নির্বাচনে তিনি কিভাবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন, জানালেন মাহফুজুর রহমান, মোশাররফ ভাইয়ের বাবা মুসলিম লীগ নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতার ছেলেকে দলে এনে প্রার্থী করেন। যাতে মুসলিম লীগের নেতারা বিরোধিতা করতে না পারেন। এম এ আজিজের হাত ধরেই মোশাররফ ভাই আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
ডাকসাইটে নেতা হলেও মোশাররফ ছিলেন শান্ত, ধীর মেজাজের কিন্তু আবেগপ্রবণ। শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, স্মার্ট নেতা হিসেবে সমাদৃত ছিলেন সর্বমহলে।
২০১৮ সালে শেষবার চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে তিনি নির্বাচন করেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আর অংশ নেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর ২৭ অক্টোবর তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান।
