প্রতি বছর হজ মৌসুমে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুমিন মুসলমান মহান আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হন। ইসলামের এই অনন্য ইবাদত পালনের মাধ্যমে হাজিরা তাদের জীবনের পূর্ববর্তী সব গুনাহ মার্জনা এবং পরম দয়ালু রবের সান্নিধ্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ পান। তবে হজের এই বিশাল ও মহিমান্বিত আয়োজন কেবল কিছু শারীরিক কসরত, অর্থ ব্যয় বা সাধারণ ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এক গভীর আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যম। মূলত মহান আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রতিটি ইবাদত সম্পন্ন করাই একজন হজযাত্রীর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। হজের এই দীর্ঘ সফরে মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফার প্রতিটি মুহূর্তে যদি ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে রবের কাছে প্রার্থনা করা যায়, তবেই তা হজে মাবরুর বা কবুল হজে পরিণত হয়, যার একমাত্র প্রতিদান জান্নাত। বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অভাবে হাজিরা হজের মূল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন এবং মনের অজান্তেই লোকদেখানো আমল বা আড়ম্বরপূর্ণ ভ্রমণের মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাওহিদের প্রতি সুদৃঢ় অঙ্গীকার, রিয়া (লোক দেখানো আমল) থেকে মুক্ত থাকা, ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, সুন্নতের প্রতি অনুরাগ, দোয়ার প্রতি মুগ্ধতা ও কোরআন হাদিসকে জীবনের মূল পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করাই হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের সমাগমে যে বিশাল ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাতে একজন মুমিনের হৃদয় নতুন করে জেগে ওঠে। সৃষ্টিকর্তার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রতি একান্ত অনুরাগ ও ভালোবাসায় হৃদয় বিগলিত হয়, কান্না ঝরে চোখের কোণে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচর্চাকে গভীরভাবে অনুসরণ করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ। হজের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি রুকনে, প্রতিটি আমলে তার দেখানো পথ অনুসরণ করাই একজন হাজির জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক হাজি হজের প্রকৃত তাৎপর্য না বুঝেই কেবল আড়ম্বরপূর্ণ সফর হিসেবে হজ সম্পন্ন করে থাকেন। ফলে হজের মূল শিক্ষা জীবনে প্রতিফলিত হয় না। ফরজ ইবাদত হজের অন্যতম শিক্ষা হলো, তাওহিদ বা একত্ববাদ। বলা যায়, একত্ববাদই হজের প্রাণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করো।’ (সুরা বাকারা ১৯৬) যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে আল্লাহর নির্দেশাবলির বিরুদ্ধাচরণ করে, তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আজকাল হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের অনেকেই এ বিষয়ে অসতর্ক। তারা প্রথমত হজ ও ওমরাহর নিয়মাবলি জানতে চেষ্টা করে না। জানলেও অনেকেই তা যথাযথভাবে পালন করে না। অনেকে ওয়াজিবও পরিত্যাগ করে। আর সুন্নত-
মুস্তাহাবের তো কথাই নেই। তাই হজপালনকারীদের এ বিষয়গুলো মনে রাখা আবশ্যক। এ ছাড়া ধর্ম পালনে ইখলাস যেন অর্জিত হয় এবং লোক দেখানো থেকে যেন দূরে থাকা যায়, সে বিষয়ে সতর্কতা কাম্য। এ জন্য হজের সময় আল্লাহর কাছে আকুতি প্রকাশ করতেন নবী কারিম (সা.)। তিনি দোয়ায় বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা হিজ্জাতুন লা রিয়ায়া ফিহা ওয়ালা সুময়াতা।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! এমন হজ চাই, যা হবে লোক দেখানো আমল থেকে মুক্ত।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৮৯০)
নিঃসন্দেহে দোয়া একটি অপরিসীম গুরুত্বের বিষয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার প্রতি বিশেষভাবে যতœবান ছিলেন। তিনি দোয়াকে ইবাদত সাব্যস্ত করেছেন। হজে রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক পরিমাণে দোয়া করতেন। তিনি কাবা তাওয়াফের সময়, সাফা-মারওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে, আরাফাতের মাঠে উটের ওপর বসে হাত বুক পর্যন্ত উঠিয়ে দীর্ঘ দোয়া ও কান্নাকাটি করেছেন। এ ছাড়া মুজদালিফায় ও দুই জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ দোয়া করেছেন। আমাদেরও উচিত, হজের সফরে বেশি বেশি দোয়া করা, গুনাহ থেকে তওবা করা, সুখ-সমৃদ্ধি, সুস্থতা ও উন্নতির জন্য দোয়া করা। হজে যাওয়ার আগেই নির্দিষ্ট কিছু দোয়া মুখস্থ করা। কারণ হজের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রয়েছে নির্দিষ্ট দোয়া, যেমন তাওয়াফে, সায়িতে ও আরাফাতের ময়দানে। হজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি চেষ্টা করুন যেন আপনার হজ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হজের মতো হয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিলহজ মাসের এগারো ও বারো তারিখে মিনায় অবস্থান করা সব মাজহাবেই ওয়াজিব। শুধু হানাফি মাজহাব মতে সুন্নত। কিন্তু সুন্নত বলে তা অবহেলার নয়। দেশে থাকাকালে আমরা কত শত সুন্নত পালনের চেষ্টা করি এবং অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করি। আবার কখনো কখনো অধীনস্তদের ওপর চাপ প্রয়োগ করি। কিন্তু হজে এসে এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটিকে সুন্নত ভেবে আমরা অনেকেই ত্যাগ করি। ওজর-আপত্তি ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) করেছেন, এমন আমল পরিত্যাগ করি। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হাজি সাহেবরা তো দ্বীনকে জিন্দা করতে এবং নিজেকে সুন্নত পালনে আগ্রহী করতেই হজে যাচ্ছেন। সুতরাং হজের সফরে সুন্নত আদায়ে বেশি চেষ্টা করা উচিত। হজের সফরে এসে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করার সুযোগ পাওয়া যায়। এই সুযোগটিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে কাজে লাগানো উচিত।
লেখক: শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
