লুট হয়ে যায় শিশুকাল

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম

কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক মানদ- হচ্ছে সেই রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্থ পরিবেশ দিতে পারছে। কারণ শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, সামাজিক স্থিতি এবং নাগরিক সংস্কৃতির ভিত্তি। যে সমাজে শিশুরা ভয়, সহিংসতা, অপুষ্টি, অবহেলা আর মানসিক অনিরাপত্তার মধ্যে বড় হয়, সেই সমাজের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আজ অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামাজিক সূচকের নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার দাবি করছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশু ধর্ষণ, আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি, শিশুশ্রম, আত্মহত্যা এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার খবর প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত জায়গাগুলো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, মাদ্রাসা, হেফজখানা, এতিমখানা অনেক ক্ষেত্রেই এখন শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কি সত্যিই শিশুবান্ধব ও মানবিক উন্নয়ন! দেশে শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটা গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, শারীরিক শাস্তি, মানসিক নিপীড়ন, অনলাইনে হয়রানি, শিশুশ্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাসিক মাদ্রাসা ও হেফজখানায় শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নতুন করে জাতীয় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু বলাৎকার, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু কেবল প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো পুরো বাস্তবতা নয়। শিশু অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় আবেগ, প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কার কারণে বহু পরিবার অভিযোগই করতে পারে না। ফলে অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজ বাড়িতে তিন মেয়েশিশুসহ পাঁচজনকে হত্যার সংবাদ আবারও মনে করিয়ে দিল, বাংলাদেশে শিশুর জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ স্থান অনেক সময় তার নিজের ঘর। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে যশোরের অভয়নগরে পারিবারিক কলহের জেরে এক ব্যক্তি নিজের দুই মেয়েকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ফরিদপুরে গত এপ্রিলে একজন শিশুকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কক্সবাজারে জমিজমার বিরোধে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তিন মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল শুধু বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়। সংবাদপত্রের এসব খবর স্পষ্ট করে, শিশুরা এখন শুধু দুর্ঘটনা বা বাইরের অপরাধের শিকার নয়, তারা বড়দের মানসিক বিকারের সবচেয়ে অসহায় বলি হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিংসতাকারী কোনো অচেনা অপরাধী নয়, পরিবারেরই পরিচিত মানুষ। ফলে বাংলাদেশের বহু শিশু এমন শৈশবে বড় হচ্ছে, যেখানে নিজের ঘরও তার জন্য নিরাপদ নয়। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৩০৮ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার ১৪.৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিলেন শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষাগুরু। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ৩০৬ মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১২৯ শিশু। নির্যাতিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর বয়স মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে। অর্থাৎ শৈশবের সবচেয়ে নিরাপদ সময়টুকুও শিশুরা এখন সহিংসতার ঝুঁকিতে আক্রান্ত।  এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটা স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন বা সূচক। কারণ প্রত্যেকটি সংখ্যার পেছনে আছে একজন শিশুর ভেঙে যাওয়া শৈশব, আতঙ্কিত মানসিকতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কুষ্টিয়ার এক মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, নরসিংদীর আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনা, মেহেরপুরে হিফজখানায় শিশুনির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার, রাজশাহীতে নির্যাতনের আলামতসহ এক শিশুশিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি এসব ঘটনা দেখাচ্ছে এই সমস্যা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। কখনো বলাৎকারের শিকার শিশু অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হচ্ছে, কখনো রহস্যজনক মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, আবার কোথাও পরিবারকে আপসের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষাকে শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে পরিবারকে চাপ দেওয়া, ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন এসব অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার আরও একা হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা শুধু আইনের দুর্বলতা নয়, এটা সামাজিক নৈতিকতার গভীর সংকটও প্রকাশ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন সহিংসতা শিশুর শরীরের পাশাপাশি তার মানসিক জগৎকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন, বিষণœতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো কঠিন সংকটে ভোগে। তাদের মধ্যে কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, কেউ মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। আন্তর্জাতিক গবেষণাও বলছে, শৈশবে যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ জীবনে মানসিক রোগ, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং সামাজিক সম্পর্কের জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুর মানসিক পুনর্বাসনের চেয়ে ‘ঘটনা চেপে যাওয়া’কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। শুধু যৌন সহিংসতাই নয়, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি সহিংস আচরণ এখনো বহু ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক মনে করেন, মারধর, অপমান বা ভয় দেখানো ‘শাসনের’ অংশ। অথচ শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ভয় ও অপমান শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, তার সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং পরবর্তী জীবনে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে এখনো অনেক শিশু স্কুলে অপমান, শারীরিক শাস্তি কিংবা মানসিক চাপের কারণে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে শিশুস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব সেই দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে শিশুমৃত্যু সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার শিশু। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সুশীল সমাজের অনেকে এই ঘটনাকে সরাসরি অবহেলাজনিত শিশুমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সংকট শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, এটা দেশের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তোলে। কারণ হাম এমন একটি রোগ, যা কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। অথচ এখন প্রতিরোধযোগ্য রোগেই শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এর অর্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও তদারকিতে গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

অপুষ্টিও বাংলাদেশের শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক ভয়াবহ সংকট। ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি, কম ওজন এবং তীব্র পুষ্টিহীনতার হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (গওঈঝ) ২০২৫-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে শিশু পুষ্টিকে দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, মাতৃপুষ্টির ঘাটতি এবং পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এই সংকটকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারে এখনো বহু শিশু প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। অনেক পরিবারের খাদ্যতালিকায় দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ফল বা সবজি পর্যাপ্ত থাকে না। ফলে শিশুর শুধু শারীরিক বৃদ্ধি নয়, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবের অপুষ্টি ভবিষ্যৎ শিক্ষা, কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

তবে সংকট শুধু দরিদ্র পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে ভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, মোবাইল ও স্ক্রিনে অতিরিক্ত আসক্তি, খেলাধুলার জায়গার অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুদের অবসর, খেলাধুলা এবং পারিবারিক যোগাযোগের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে উদ্বেগ, বিষণœতা, স্থূলতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যাও বাড়ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিশুদের একাংশ যেখানে অপুষ্টি ও খাদ্যঘাটতির মধ্যে বড় হচ্ছে, অন্য অংশ সেখানে মানসিক চাপ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। দুই বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত শিশুর স্বাভাবিক শৈশবকে সংকুচিত করে ফেলছে। শিশুশ্রমও বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ শিশু এখনো শ্রমে নিয়োজিত। তারা কাজ করছে কারখানা, পরিবহন খাত, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে। অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষাব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল তদারকি শিশুশ্রম কমানোর পথকে কঠিন করে তুলেছে।

এই সংকটগুলোর পেছনে আরও গভীর সামাজিক বাস্তবতা আছে। আমাদের সমাজে এখনো শিশুকে পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়নি। পরিবারে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, তাদের আবেগকে তুচ্ছ করা, ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা ব্যাপক। ফলে অনেক শিশু নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার সাহস পায় না। এর অর্থ দাঁড়ায়, শিশু আমাদের রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিয়ে আইন আছে, নীতিমালা আছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। শিশু নির্যাতনের বিচার দীর্ঘ হয়, তদন্তে গাফিলতি থাকে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুনামের জন্য ঘটনা গোপন করার চেষ্টা করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। আবাসিক মাদ্রাসা, এতিমখানা, হেফজখানা ও হোস্টেলগুলোতে স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর করা। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং স্বাধীন তদন্ত কাঠামো গড়ে তোলা। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবার পর্যায়ে শিশুদের প্রতি সহনশীল ও মানবিক আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বাংলাদেশ আধুনিক, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্রে পরিণত হতে চাইলে শিশুদের প্রশ্নকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুবান্ধব রাষ্ট্র গঠন এখন শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটা জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত।

লেখক: চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট,  ইউনিসেফ

[email protected]   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত