ভারতের উত্তর প্রদেশে শক্তিশালী ধূলিঝড় ও বজ্রবৃষ্টির (থান্ডারস্কুয়াল) তাণ্ডবে অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাজ্যটির পাঁচটি জেলা ভাদোহি, ফতেপুর, বুদাউন, চন্দৌলি এবং সোনভদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে ল-ভ- হয়ে গেছে জনপদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ভাদোহি জেলায়। মাত্র কয়েক মিনিটের ঝড়ে উপড়ে গেছে শত শত গাছ, ধসে পড়েছে মাটির দেয়াল এবং বিকল হয়ে পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ত্রাণকাজে যেকোনো ধরনের গাফিলতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ঝড়-বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে প্রয়াগরাজ; সেখানে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ভাদোহিতে ১৮, মির্জাপুরে ১৫, ফতেহপুরে ১০ এবং উন্নাও ও বদায়ুনে ৬ জন করে মারা গেছেন। প্রতাপগড় ও বেরিলিতে ৪ জন করে এবং সীতাপুর, রায়বেরেলি ও চন্দোলিতে ২ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। কানপুর দেহাত, হারদোই, সম্ভল, কৌশাম্বী, শাহজাহানপুর, সোনভদ্র ও লখিমপুর থেকেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বুধবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই উত্তর প্রদেশের আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে। ধুলোর মেঘে ঢেকে যায় রাজ্যের বিশাল অংশ। তীব্র বাতাসের তোড়ে হোর্ডিং ও টিনের চালা উড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষকে উড়ালসড়ক ও গাছের নিচে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। ঝড়ে উপড়েপড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে অনেক যানবাহন দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বেশ কিছু রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। ঝড়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়েন। উদ্ধারকারীরা অনেক জায়গায় খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। বেরিলিতে একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শক্তিশালী বাতাসের ধাক্কায় এক ব্যক্তি দূরে ছিটকে পড়েন; এতে তার হাত-পা ভেঙে গেছে। গত ১৩ মে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের (আইএমডি) পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, উত্তর পাকিস্তান ও জম্মু অঞ্চলের ওপর একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা অবস্থান করছে। এটি ভূমধ্যসাগর থেকে উৎপন্ন হওয়া একটি নিম্নচাপ। যা ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে।
প্রতি বছর মে মাসে উত্তর ভারতে এই প্রাণঘাতী ঝড়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নেপথ্যে রয়েছে বায়ুমণ্ডলের এক জটিল সমীকরণ। মে মাসে উত্তর ভারতের সমতল ভূমিতে তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন ভূপৃষ্ঠের ওপরের বাতাস প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে থাকে, যাকে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা বলেন ‘কনভেকশন’। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে অন্য দিক থেকে আর্দ্র ও শীতল বাতাস তীব্রবেগে ছুটে আসে। দুই বিপরীতমুখী বাতাসের সংঘর্ষে তৈরি হয় বিশাল আকৃতির ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ। এই মেঘ থেকেই সৃষ্টি হয় বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। যখন এই মেঘগুলো ভেঙে পড়ে, তখন এর ভেতরকার শীতল বাতাস প্রচণ্ড বেগে মাটির দিকে আছড়ে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মাটির উপরিভাগের আলগা ধুলোবালি সঙ্গে নিয়ে এটি এক দানবীয় রূপ ধারণ করে, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আঁধি’। এই আঁধির তীব্রতায় দৃষ্টিসীমা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
পুনের আইআইটিএম-এর গবেষক ও বিভিন্ন গবেষণাপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানের মরু অঞ্চল থেকে আসা শুষ্ক পশ্চিমী বাতাস এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র পুবালি বাতাসের সংঘর্ষে এই তীব্র বজ্রঝড় ও ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় উত্তর প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
