পদ্মা নদীর উজানে ভারতের ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণের প্রভাবে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ। একসময়ের প্রমত্তা পদ্মা নদী এখন জীর্ণ দশা। কৃষিতেও পড়েছে ভয়ঙ্কর প্রভাব। পরিস্থিতির বদল না হলে খাদ্যঘাটতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি পাস হওয়া পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। তারপরও পদ্মায় খরা মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলার ফারাক্কা নামক স্থানে গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে ভারত সরকার। যেটি ‘ফারাক্কা বাঁধ’ নামে পরিচিত। ১৯৬১ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেন। অভূতপূর্ব সেই লংমার্চ কর্মসূচির স্মরণে প্রতি বছর ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস পালিত হয়। বিভিন্ন সংগঠন আজ এ দিবসটি পালন করছে।
এ অঞ্চলের সবচেয়ে খরস্রোতা ছিল পদ্মা নদী। পদ্মা নদীর শান্ত রূপ দেখে বোঝার উপায় নেই এটি সেই প্রমত্তা পদ্মা নদী। একসময় এখানে আছড়ে পড়া ঢেউ ছিল, ছিল পানির গর্জন। পাল তোলা নৌকা, বড় বড় জাহাজ চলত এ নদীতে। এসবই এখন পুরনো স্মৃতি। শিশুদের সামনে এই গল্প করলে তারা এটিকে রূপকথার গল্পের মতোই মনে করে। পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধ হওয়ার আগে যে জোয়ার ছিল, বাঁধ হওয়ার পর থেকেই নদীর চেহারা বদলে যেতে থাকে। যেখানে একসময় জাহাজ চলত, সেখানেই এখন ফসল ফলাতে ব্যস্ত কৃষক। বর্ষা মৌসুম ছাড়া পদ্মা নদীর রাজশাহী পয়েন্টে পানির দেখা মেলা কষ্টকর। বছরে ২-১ মাস নদীতে পানি থাকে আর বাকি সময়জুড়ে থাকে ধু-ধু বালুচর। পদ্মা নদীতে খরা মৌসুমে তো পানি থাকেই না, বর্ষা মৌসুমেও পানির সরবরাহ থাকছে তুলনামূলক কম। এ কারণে গত দুই দশকে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় তেমন বন্যাও হয়নি। এসবই হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, পদ্মা নদীতে যে পানি আসছে তা আমাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। পানির অভাবে পদ্মার বুকে চর জেগেছে। শুধু পদ্মা নদী নয়, এ অঞ্চলের শাখা নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীও মনে করেন পদ্মার উজানে দেওয়া ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ। পদ্মা নদীতে এখন অসংখ্য চর জেগেছে। পদ্মার বেশ কিছু শাখা নদী, উপ-শাখা নদী মরে গেছে। তিনি বলেন, আমাদের পানির ন্যায্যহিস্যা আদায়ের জন্য সোচ্চার থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কোনো সুযোগ নেই। দেশের মানুষ এখন সোচ্চার। ভারতকে অবশ্যই আমাদের অধিকার দিতে বাধ্য করতে হবে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর মনে করেন, সম্প্রতি একনেকে পাস হওয়া পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের খরা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের ২৩ জেলা এ ব্যারাজের মাধ্যমে জমা হওয়া পানির মাধ্যমে উপকৃত হবে। কৃষি ক্ষেত্রে নতুন দিন ফিরে আসবে।
তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আগেই খরা মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়া ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা প্রয়োজন। ফারাক্কার প্রভাবে রাজশাহী অঞ্চলের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার এখানকার কৃষি এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ফসল চাষের ধরনও বদলে যাবে। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। এর প্রভাবে খাদ্য ঘাটতিও তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, নদীর পানির সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য যে প্রকল্পই নেওয়া হোক, পদ্মার পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা জরুরি। নিজেদের সঠিক অবস্থানে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যারাজ নির্মাণের পর যদি খরা মৌসুমে পানি না পাওয়া যায়, তবে তো সেই ব্যারাজে কাজ হবে না। অর্থাৎ আমাদের পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।
