গত শনিবার কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের সময় মারা যান খুলনার অক্ষর সৌভিক রায়। মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনেও মা জানেন না ছেলে সৌভিক মারা গেছে। জানা যায়, আত্মীয়-স্বজনরা মৃত্যুর বিষয়টি তার মাকে জানাননি। তাকে শুধু সৌভিক আহত হয়েছে এমন খবর জানানো হয়। তার মা যখন বলছেন আমার ছেলে কোথায়? কখন ফিরবে? তখন নির্বাক স্বজনরা শুধু তাকে মিথ্যা সান্ত¡না দিয়ে যাচ্ছেন। তার মা এখনো জানেন না, ছেলে সৌভিক আর কোনো দিন ফিরবে না।
গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে খুলনা নগরীর শহীদ হাদিস পার্ক সংলগ্ন মান্নান চটপটির গলির ‘দোলন’ ভবনের চতুর্থ তলায় সৌভিকদের ফ্ল্যাটে যান এ প্রতিবেদক। সেখানে দেখা যায়, শ্মশানের নিস্তব্ধতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। সবাই নির্বাক। শুধু তার মাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার ছেলে কোথায়? কখন ফিরবে?’ পরিবারের সদস্যরা সৌভিকের মৃত্যুর খবর মাকে জানায়নি বলে জানা যায়।
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান সৌভিক (৩০)। গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে এ ঘটনা ঘটে। তার অফিসের টিম নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুশোকে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার থেকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। ভিডিও দেখে আত্মীয়রা নিশ্চিত হন, সৌভিকের মরদেহ।
জানা গেছে, অক্ষর সৌভিক খুলনা নগরীর কালীবাড়ি এলাকার সাবেক ব্যবসায়ী মৃত শেখর রায়ের ছেলে। সৌভিক খুলনা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি ও ভারতের গুজরাটের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। ঢাকার একটি ভিসা এজেন্সিতে কাজ করতেন। ২০২১ সালে করোনায় তার বাবা মারা যাওয়ার পর তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। ব্যাংকের কছে তাদের বাড়িটি মর্টগেজ থাকার কারণে গত ছয় মাস আগে তারা ‘দোলন’ ভবনের চতুর্থতলার ফ্ল্যাটে ভাড়া বাসায় ওঠেন। স্থানীয়রা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন সৌভিক। তার অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মা শুক্লা রায়, ছোট বোন শীর্ষা রায় এবং দাদু ও দিদিমা তাদের সঙ্গে থাকেন। শীর্ষা পড়াশোনা করে। অক্ষর ঢাকায় চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত সৌভিক রায়সহ ৯ জন যুবক খুলনা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে যান। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সৌভিক তার বন্ধুদের নিয়ে দরিয়ানগর সৈকতে যান। এরপর দুই হাজার টাকায় টিকিট কেটে প্যারাসেইলিংয়ে আকাশে ওড়েন। প্যারাসেইলিং ৩শ-৪শ ফুট ওঠার পর হঠাৎ সৌভিক নিচে বঙ্গোপসাগরে ছিটকে পড়েন। কিছুক্ষণ পর প্যারাসেইলিং কর্মচারীরা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সৌভিকের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া একজন জানিয়েছেন, প্যারাসেইলিং থেকে যখন সৌভিক সমুদ্রে ছিটকে পড়ছিলেন, তখন উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দরিয়ানগরে কোনো লাইফগার্ড চোখে পড়েনি। একটি স্পিডবোট সৌভিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, ততক্ষণে সব শেষ।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার সূত্রে জানা গেছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক তিন দিন আগে দরিয়ানগরসহ সব প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্যারাসেইলিং করা হচ্ছিল। এতে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্যারাসেইলিংয়ের জন্য প্রশাসন থেকে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
