বানের পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরে ভেসে উঠেছে ফসলের ক্ষতচিহ্ন। হাওরের বাতাসে এখন শুধু পচা ধানের দুর্গন্ধ আর প্রান্তিক কৃষকদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ। প্রকৃতির বৈরিতা আর বাজারের অস্থিরতায় পিষ্ট হাওরের কৃষকরা। হাওর পাড়ের হাজারো কৃষকের গল্প এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ভরা। মহাজনের ঋণ আর সঞ্চিত অর্থে হাওরে ফসল আবাদ করলেও এবার ডুবেছে সব। সেই ফসল কোনো রকমে কেটে পাড়ে তুললেও অনেক ধানে গজিয়েছে চারা। ফলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও বছরের একমাত্র ফসল কপালে জোটেনি হাওরাঞ্চলের অনেক কৃষকের।
নেত্রকোনার জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, কলমাকান্দাসহ হাওরের প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১১ হাজার হেক্টর। এখনো হাওরে একরের পর একর জমি ডুবে আছে পানির নিচে। এসব জমি থেকে ধান সংগ্রহ করতে কৃষকদের কাঠাপ্রতি খরচ হচ্ছে ৩ হাজার টাকারও বেশি। তবে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও বাজারে কাক্সিক্ষত মূল্য মিলছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
কৃষকরা বলছেন, হাওরে ধানের দাম মণপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। এবার চাষাবাদ ও ধান কাটতে খরচ হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। খরচ তুলতেই তাই কৃষকের হিমশিম অবস্থা। আর জেলার অন্যতম বড় ধানের হাট দুর্গাপুরে আসছে নতুন ধান। বাজারে মানভেদে মোটা ধান সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
চলতি বছর নেত্রকোনায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর। তবে কয়েক দফা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৭৪৮ হেক্টর পাকা ধানের জমি। এর মধ্যে পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে গেছে ১৬ হাজার ৮৭৭ হেষ্টর বোরো ফসলের জমি, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই ক্ষতির পরিমাণ ২৩৭ কোটি টাকা।
আটপাড়ার বাগরার হাওরের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘হাওরের অবস্থা তো খারাপই, পানিতে সব তলিয়ে গেছে। কাঠাপ্রতি তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। এরপরেও কামলা পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু কিছু স্থানে কামলা পাওয়া গেলেও তাদের দিনমজুরি অনেক বেশি। এখন বেশিরভাগ ধান পানির মধ্যেই কাটা হচ্ছে আর নৌকা দিয়ে তুলে আনা হচ্ছে পাড়ে। এবার তো ধানের দর নেই, এ জন্য পাইকাররা ধান নেয় না। এই বছর হাওরে অনেক পরিশ্রম হচ্ছে; এরপরেও আমরা যে খরচ করেছি, তা তুলে আনা নিয়ে অনেক চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছি।’
হাওর পাড়ের আরেক কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাওরে রোদ থাকলে ফসল তোলা এবং মাড়াই করা কিছুটা সহজ হয়। কিন্তু এ বছর যে পরিমাণে বৃষ্টি হয়েছে, এতে ইতিমধ্যে আমাদের অনেক ফসল ডুবে গেছে। কিছু কিছু ফসল কেটে পাড়ে আনতে পারলেও এতেও খরচ হয়ে গেছে অনেক বেশি। এখনো আমাদের অধিকাংশ জমি পানির নিচে ডুবে আছে। এগুলো আর তোলা যাবে না। তাই এগুলোর আশাও আমরা ছেড়ে দিয়েছি।’
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর অতিবৃষ্টি ও আগাম পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের নিচু জমি তলিয়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কৃষকরা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাওরে ইতিমধ্যে ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। তবে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে প্রায় ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুরোপুরি ক্ষতি হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭ হেক্টর ফসলি জমি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে দামের বিষয়ে হাওরের অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন। কিছুদিন আগে হাওরে ধান কেনার মতো কোনো ক্রেতাই ছিল না। তাছাড়া এই অঞ্চলে অটো রাইস মিলের মালিক তেমন একটা নেই। এমনকি লোকাল ক্রেতারাও তেমন একটা মাঠে নামেনি। মূলত বাইরে থেকে যেসব ক্রেতা হাওর অঞ্চল থেকে ধান কিনতে আসতেন, তারা এবার না আসার ফলেই ধানের দামে একটা প্রভাব পড়েছে। তবে আমরা ইতিমধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি। ইতিমধ্যে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে হাওরের কৃষকরা কিছুটা লাভবান হবেন বলে আমরা আশা করি।’
