আগামী বাজেটে ‘ওয়াশ’ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

দেশের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য দূর করে আগামী জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছে খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। 

বুধবার (২০ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ আয়োজিত এক প্রাক-বাবেট সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হলে ওয়াশ খাতে বরাদ্দের বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা রোধ করতে হবে এবং সমতাভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশের হেড অব পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন ফাইয়াজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় পিপিআরসির প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ, এন্ড ওয়াটার পোভার্টির প্রতিনিধি মো. ফজলুল হক, স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার ফর অল-এর প্রতিনিধি মাসুদ রানাসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশের ওয়াশ খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দেশে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতাধীন সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার সম্প্রসারণ ঘটলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এডিপিতে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৯.৭৭ বিলিয়ন টাকা, যা বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮৭.২৮ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়। তবে এরপর থেকেই বরাদ্দ কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ১৪৯.৮১ বিলিয়ন টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৬.১৭ বিলিয়ন টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ১০৯.০১ বিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে।

মূল বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ওয়াশ খাতে এডিপি বরাদ্দের এই নিম্নমুখী প্রবণতা খুবই দুর্বল পলিসি সিগন্যাল দিচ্ছে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ সুপেয় পানি ও নিরাপদ স্যানিটেশন শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে আছি। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই খাতে বরাদ্দ বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের বৈষম্য, শহরের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং দুর্গম অঞ্চলের অবহেলা স্পষ্ট। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও গাজীপুরে বরাদ্দের হার উচ্চ হলেও চট্টগ্রামের মতো বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বরাদ্দ তুলনামূলক কম, এবং চরাঞ্চলও এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ওয়াশ খাতে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীল টয়লেট, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্পষ্ট করেন যে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে ডিপিএইচই, সিটি কর্পোরেশন, এবং নগর ও গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।

বক্তারা উল্লেখ করেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাই এখন ওয়াশ খাতে নতুন উদ্ভাবন ও জলবায়ু সহনশীল উদ্যোগ বাস্তবায়নের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী বাজেটের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—এডিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওয়াশ বাজেট বৃদ্ধি, গ্রাম ও শহরে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা সম্প্রসারণ, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

এছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ, গভীর নলকূপ স্থাপন, বস্তিতে নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৃথক শৌচাগার ও ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা চালুর সুপারিশ করা হয়। একই সাথে ফ্যামিলি কার্ড বা প্রস্তাবিত হেলথ কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০০-৫০০ টাকা ‘ওয়াশ ভাতা’ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, যা অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াবে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করবে। পরিশেষে বক্তারা চর, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল, পার্বত্য এলাকা ও বস্তিবাসীর জন্য বিশেষ ওয়াশ সহায়তা এবং জলবায়ু সহনশীল পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খাল খনন ও বড় জলাধার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত