পবিত্র ঈদুল আযহা আর মাত্র চার দিন বাকি। জমে উঠেছে গাইবান্ধার হাটগুলো। হাটে এবার প্রচুর গরুর আমদানি হলেও ক্রেতা কম। গরু বিক্রি না হওয়ায় খামারিরা হাট থেকে গরু ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। আগের বছরের তুলনায় এবার গরুর দামও কম।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়াপুর হাট। হাটটি গাইবান্ধা সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের অর্ন্তভুক্ত। জেলার বড় হাটগুলোর মধ্যে একটি। সপ্তাহে দুই দিন (শুক্রবার ও মঙ্গলবার) এ হাট বসে।
শুক্রবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাট ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল বিস্তৃণ এলাকা। হাটে প্রচুর গরু উঠেছে। ছোট-বড় গরু আলাদা করে। বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে গরু। ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন আর দরদাম করছেন। হাটে প্রচুর ভিড়। প্রচণ্ড গরম। তবে গরুর সঙ্গে আসা অনেক খামারিরা মজুরির ভিত্তিতে দালাল কিংবা একশ্রেণির ভাড়া করা লোক নিয়োজিত করেন। তারা গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গরুর দরদাম হলে খামারি ও ক্রেতার কথা হয়। তারপর বিক্রি ও চালান হয়।
তাদের দাবি, গত বছরে ঈদের চারদিন আগে অনেক গরু কিনেবেচা হতো। কিন্তু এবার হাটে ক্রেতা কম।
আর ক্রেতা বলেন, হাটে গরু দেখে পছন্দ হচ্ছে। কিন্তু দামে বনছে না। খামারিরা দাম ছাড়ছে না। ছোট গরুর চাহিদা ও দাম বেশি। ঈদের আর কয়েকদিন বাকি। তাই দাম যাচাই করতে এসেছেন অনেকেই।
ঠাকুরের ঠিঘি এলাকার বাসিন্দা কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, এই জেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষক। তারা ধান-চাল বিক্রি করে সাধারণত কুরবানির পশু ক্রয় করে থাকেন। কিন্তু এবার বোরো ধান কাটা শুরু থেকে বৃষ্টি । ধানের দাম কম। ধান নিচ্ছে না ব্যাপারীরা। তাই ঈদের পশু কেনা নিয়ে এই এলাকার মানুষের চিন্তা কম।
খোলাহাটি গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন,মানুষের আয়রোজগার কমে গেছে। গ্রামের কয়েকজন মিলে একটি গরু কুরবানি দিতে হবে বলে হাটে গরুর বাজারদর যাচাই করতে এসেছি। আগাম হাটে পশু কিনবো।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়, জেলার সাতটি উপজেলায় ১১ হাজার ৮২১টি বাণিজ্যিক পশু খামার আছে। এসব খামারে ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৭৭টি গরু ও ছাগল রয়েছে। এরমধ্যে গরু ৫৮ হাজার ৭৬৭টি এবং ছাগল ৭৯ হাজার ৫১০টি। এবছর জেলায় মোট ৩২টি পশুরহাট বসছে। এরমধ্যে স্থায়ী পশুরহাট ১৯টি ও কোরবানির ঈদের আগে অস্থায়ী পশুরহাট বসে ১৩টি। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে উপজেলা ওয়ারি পশুরহাটের মধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ৬টি, গোবিন্দগঞ্জে ৭টি, সুন্দরগঞ্জে ৬টি, পলাশবাড়ীতে ৩টি, সাদুল্লাপুরে ৪টি, সাঘাটায় ৩টি এবং ফুলছড়িতে ৩টি হাট রয়েছে। এবছর গাইবান্ধা জেলায় কোরবানির গরু ও ছাগলের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি। এ পরিমাণ গরু ছাগল কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বিক্রির পরও ৩৯ হাজার ৪৩৩টি গরু ছাগল উদ্বৃত্ত থাকবে”।
গরু নিয়ে বিপাকে খামারিরা
এবছর ঈদুল আযহার আগে গরুর খামারিরা গরু বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। কারণ গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে পশু খাদ্যের দাম কয়েকগন বেড়েছে। শ্রমিক খরচ বেশি। গরু মেটাতাজাকরণে বেশি খরচ পড়ছে। উপরন্ত এবছর হাটে গরু-ছাগলের আমদানি বেশি। সে অনুপাতে ক্রেতা কম। ফলে গরু ছাগল বিক্রি নিয়ে খামারিরা শঙ্কায় আছেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাড়ুইপাড়া গ্রামের প্রান্তিক খামারি ভুট্টু মিয়া বলেন, কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদ করে পোষায় না। তাই তিনবছর ধরে গরু মোটাতাজাকরণের ব্যবসা করছি। আমার খামারে ছয়টি গরু রয়েছে। এগুলো পাঁচমাস আগে কিনেছি। আশা ছিল ঈদের আগে বিক্রি করে বেশি লাভ পাবো। কিন্তু এবার লাভ তো দুরের কথা, গরু বিক্রি করে আসল টাকা তুলতে পারবো কিনা চিন্তায় আছি। একই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের দিনমজুর বাবলু মিয়া (৪৫) বলেন, সারাবছর দিনমজুরের কাজ চলে না। যখন হাতে কাজ থাকে না, তখন ধারদেনা করে খেতে হয়। তাই ঋন নিয়ে ছয়মাস আগে দুইটি গরু কিনেছি। ঈদের আগে বিক্রি করে যে লাভ হবে, তা দিয়ে দায়দেনা মেটাবো। কিন্তু এবার ক্রেতা কম। গরু বিক্রি করতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্থ হবো।
সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ গ্রামের খামারি আমির আলী (৫৫) বলেন, সারাবছর গরু মোটাতাজাকরণের খরচ অনেক বেশি। তারপর বাড়তি আয়ের জন্য এই ব্যবসা করছি। আমার খামারে সাতটি গরু রয়েছে। ছাগলও রয়েছে চারটি। তিনি বলেন, এবছর ঈদের ১০-১৫ দিন আগ থেকেই হাটে পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। কিন্তু গতবছরের তুলনায় ক্রেতা অনেক কম। তাই গরু ছাগল বিক্রি চিন্তায় আছি।
প্রাণি সম্পদ বিভাগের উদ্যোগ
ঈদকে সামনে রেখে প্রাণি সম্পদ বিভাগ থেকে জেলায় আটটি অনলাইন পশুরহাট খোলা হয়েছে। এখান থেকে জেলার বাণিজ্যিক খামারি এবং প্রান্তিক খামারিরা পশু বিক্রি করতে পারবেন।
এসব বিষয়ে জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, খামারি ও পশু বিক্রেতাদের সহায়তা করতে অনলাইনে পশু বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে গরু-ছাগল বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অসুস্থ পশু চিহ্নিত করতে জেলায় ৩০টি ভেটেনারি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
