উত্তরপ্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ঈদুল আজহার নামাজ নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। খোলা মাঠ, রাস্তা ও জনপরিসরে নামাজ আদায়ে প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং ডানপন্থি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিরোধিতায় অনেক এলাকায় মুসল্লিরা পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজ্যের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি মসজিদে ঈদের প্রস্তুতি সংক্রান্ত বৈঠকে মুসল্লিদের বিশেষ সতর্কতা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, মসজিদের বাইরে ভিড় না করতে, উসকানিতে সাড়া না দিতে এবং ভিডিও ধারণ এড়িয়ে চলতে হবে। মসজিদ পূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী জামাতের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে মুসল্লিদের।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, পুলিশের নির্দেশনা ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা প্রচারণার কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে। তাদের আশঙ্কা, খোলা জায়গায় নামাজ পড়লে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ডানপন্থি হিন্দু সংগঠন প্রকাশ্যে মুসলমানদের নামাজ আদায়ের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, রাস্তা বা পার্কে নামাজের কারণে যানজট ও নিরাপত্তার সমস্যা তৈরি হয়। সম্প্রতি বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দেশব্যাপী রাস্তায় নামাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সম্প্রতি বলেন, মুসলমানদের উচিত ঈদের নামাজ ‘পালা করে’ আদায় করা। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নির্দেশনা না মানলে ‘অন্য পদ্ধতি’ গ্রহণ করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য মুসলিম সমাজে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় মসজিদ ও ঈদগাহে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলেও খোলা স্থানে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ঈদের মতো বড় জামাতে মুসল্লিদের জন্য পর্যাপ্ত স্থানের সংকট দেখা দিচ্ছে।
আলিগড় জেলার ব্যবসায়ী আরিফ মালিক বলেন, গত ঈদে মুসল্লিরা কয়েক মিনিটের জন্য একটি খোলা মাঠে নামাজ পড়লেও পরে পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এবার অনেক পরিবারই আত্মীয়-স্বজনকে ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মসজিদ কমিটিগুলো জামাত ছোট করা, মুসল্লিদের ভাগ ভাগ হয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া এবং নামাজ শেষে দ্রুত চলে যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিরাটের বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ বলেন, আগে ঈদের সকাল ছিল আনন্দময়। এখন মানুষ আতঙ্কে থাকে-পুলিশ আসবে কি না, কেউ ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবে কি না, সেই চিন্তায় অনেকে ভীত।
বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিমদের প্রকাশ্যে নামাজ নিয়ে বিতর্ক ভারতের জনপরিসরে ধর্মীয় পরিচয় ও দৃশ্যমানতা নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। তাদের মতে, মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ক্রমেই সন্দেহ ও নজরদারির চোখে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, মুসলিমদের ধর্মীয় সমাবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও বৃহদাকার হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রায় প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: আলজাজিরা
