রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন নিজেই জায়গা সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত স্টোর রুম না থাকায় হাসপাতালের বারান্দা, খোলা জায়গা এমনকি গাড়ি পার্কিং এলাকায়ও রাখা হচ্ছে বেড, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন মালামাল। এতে রোগী ও স্বজনদের চলাচলে বাড়ছে দুর্ভোগ, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে সারি সারি করে রাখা নতুন ও পুরনো বেড। কোথাও পড়ে আছে ভাঙা হুইলচেয়ার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ব্যবহৃত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র। খোলা আকাশের নিচে ও দোচালা টিনের ভাঙা ঘরে পড়ে থাকায় ধুলাবালি ও বৃষ্টির পানিতে এসব সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালের স্টোরের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। সম্প্রতি একসঙ্গে ৪০০ বেড সরবরাহ আসায় সংকট আরও বেড়েছে। তিনি জানান, শহীদ মিনারসংলগ্ন ভবনের দোতলাসহ কয়েকটি স্থানে নতুন স্টোর রুম করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘জায়গা সংকটের কারণে বারান্দা, গাড়ি পার্কিং এলাকা এমনকি চিকিৎসকদের কোয়ার্টারেও মালামাল রাখতে হচ্ছে। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় বাজেটের তুলনায় আমরা অনেক কম বরাদ্দ পাই।’
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বারান্দাজুড়ে মালামাল থাকায় জরুরি মুহূর্তে রোগী স্থানান্তরে ভোগান্তি বাড়ছে। স্ট্রেচার কিংবা হুইলচেয়ার নিয়ে দ্রুত চলাচল করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী জানান, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা সরঞ্জাম হাসপাতালে এলেও সেগুলো সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত স্টোরেজ নেই। ফলে বাধ্য হয়েই বারান্দা ও খোলা স্থানে রাখতে হচ্ছে মালামাল।
অবশ্য, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে যেসব পুরনো মালামাল রয়েছে তা একটু মেরামত করলেই পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়। নতুন করে কেনার প্রয়োজন হয় না। পুরনো বিছানা রাখার জায়গা হয় না। নতুন বিছানা রাখব কোথায়।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডাক্তার আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন চার থেকে সাড়ে চার হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালে ঢাকা মেডিকেলের জন্য ৫ হাজার শয্যার একটি মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর সেটির বাস্তবায়ন থমকে যায়। এখন এই ২ হাজার ৬০০ বেডে ৪ হাজার রোগীর সেবা নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তারসহ কর্মকর্র্তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেঝে ও বারান্দাতেই চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় ১৪০০ রোগী। ওয়ার্ডে সিটের ফাঁকে ফাঁকে মেঝেতে ও এক বেডে দুজন রেখে চিকিৎসা দিচ্ছে এই হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটিতে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করছে। দ্রুত আধুনিক স্টোরেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের দাবি জানান তারা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা জানান, প্রতিদিন সারা দেশ থেকে এখানে রোগী আসে চিকিৎসা নিতে। সুচিকিৎসার সুনাম থাকায় এই হাসপাতালটির বারান্দা, মেঝে ও সিঁড়িতে রাত কাটিয়ে হলেও সেবা নিতে চায় রোগীরা। প্রতিটি জেলার সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র থাকলেও দুপুরের পর কোনো অপারেশনজনিত চিকিৎসা না দেওয়ায় বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালের রোগীকেই ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। এসব রোগীর ৮০ ভাগই আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
তাই এই হাসপাতালে রয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। নেই পর্যাপ্ত জনবল। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কারণ, দুর্ঘটনায় আহত, আগুনে দগ্ধ, জটিল ও দুরারোগ্যসহ নানা রোগে আক্রান্ত রোগী এই হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে চিকিৎসাসেবা পাবেনই এমনটা মনে করে সবাই। তাই সারা দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিন বহু রোগী ছুটে আসে এই হাসপাতালে।
