যেমন ছিল নবীকন্যা ফাতেমার সংসার

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ এএম

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু পরিবার আছে, যা সব যুগের মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.) এবং তার স্বামী হজরত আলী (রা.)-এর সংসার ছিল তেমনই এক আলোকিত দৃষ্টান্ত। অভাব, কষ্ট ও সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও তাদের ঘর ছিল ইমান, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং মহান আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থায় পরিপূর্ণ।

হজরত ফাতেমা (রা.) শৈশব থেকেই ইসলামের কঠিন সময় প্রত্যক্ষ করেছেন। মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, সামাজিক বয়কট এবং নানা সংকটের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছেন। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতের পর তার বিয়ের বিষয়টি সামনে আসে। হজরত আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) প্রস্তাব দিলেও মহানবী (সা.) এ বিষয়ে নীরব ছিলেন। তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন।

একসময় হজরত আলী (রা.) লজ্জায় নতমুখে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হন। মহানবী (সা.) তার মনের কথা বুঝতে পেরে ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। আলী (রা.) সম্মতি দিলে দেনমোহর সম্পর্কে জানতে চান। তখন তার কাছে ছিল একটি ঘোড়া ও একটি লৌহবর্ম। যুদ্ধের প্রয়োজন বিবেচনায় ঘোড়াটি রেখে বর্মটিকে দেনমোহর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। বর্মটি ওসমান (রা.) ৪৮০ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দিয়ে কিনে নেন এবং আলী (রা.)-কে সেটি উপহার হিসেবে দেন। নবীজি (সা.) ওসমান (রা.)-এর জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধের পর তাদের পবিত্র বিয়ে সম্পন্ন হয়।

বিয়ের পর কন্যাকে স্বামীর ঘরে বিদায় দেওয়ার সময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। নবদম্পতির ঘরে গিয়ে তাদের জন্য বরকত ও কল্যাণের দোয়া করেন। এই দোয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসারজীবন।

তবে এই সংসার ছিল না ধনসম্পদে সমৃদ্ধ। হজরত আলী (রা.) নিজেই বলেছেন, তাদের ঘরে ঘুমানোর জন্য ছিল মাত্র একটি ভেড়ার চামড়ার বিছানা। দিনে সেটি উটের কাজে ব্যবহার করা হতো, আর রাতে সেটাই ছিল বিশ্রামের একমাত্র উপকরণ। কোনো খাদেম ছিল না, ছিল না বিলাসিতার কোনো চিহ্ন। তবু তাদের ঘরে ছিল সন্তুষ্টি, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা এবং মহান আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস।

সাংসারিক কাজের অধিকাংশই নিজ হাতে করতেন হজরত ফাতেমা (রা.)। শস্য পেষণ করতে করতে তার হাতে ফোসকা পড়ে যেত। একবার কিছু যুদ্ধবন্দি আসার পর তিনি একজন খাদেমের আশা নিয়ে বাবার কাছে যান। কিন্তু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকে এমন একটি আমল শিক্ষা দেন, যা একজন খাদেমের চেয়েও উত্তম। তিনি বলেন, ঘুমানোর আগে ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়তে। (সহিহ বুখারি) পরবর্তীকালে এটি ‘তসবিহে ফাতিমি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই অনাড়ম্বর ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন হজরত হাসান (রা.), হজরত হুসাইন (রা.), হজরত জাইনাব (রা.), হজরত উম্মে কুলসুম (রা.) এবং মুহাসসিন (রা.)। তাদের পরিবার ছিল তাকওয়া, ইবাদত, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতীক।

আজ যখন পারিবারিক সুখকে অনেকেই ধনসম্পদ ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে মেলাতে চান, তখন হজরত ফাতেমা (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-এর সংসার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত শান্তি সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সন্তুষ্টি, আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং নেক আমলের মধ্যেই নিহিত। তাদের জীবন আমাদের শেখায়, অভাব কখনো সুখের অন্তরায় নয়, যদি হৃদয় ইমানের আলোয় আলোকিত থাকে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত