বার্ধক্যের সৌন্দর্য

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৪:৫৬ এএম

মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপের নিজস্ব সৌন্দর্য ও তাৎপর্য রয়েছে। শৈশব নির্ভরতার, যৌবন শক্তি ও উদ্দীপনার আর বার্ধক্য অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা প্রদর্শনের সময়। অথচ আধুনিক সমাজে প্রায়ই বয়স বাড়াকে নেতিবাচক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তরুণ্য, গতি ও উৎপাদনশীলতার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের কারণে অনেকেই মনে করেন, বয়স বাড়া মানেই ধীরে ধীরে জীবনের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বার্ধক্য আত্মিক পরিপক্বতা, প্রজ্ঞা ও আল্লাহর আরও নৈকট্য অর্জনের মহামূল্যবান সময়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষের জীবনচক্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তারপর দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন, অতঃপর শক্তির পর দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।’ (সুরা রুম ৫৪) এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বার্ধক্য জীবনের বাইরে কোনো বিষয় নয়, বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত জীবনযাত্রারই একটি স্বাভাবিক ধাপ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক শক্তি কমতে পারে, বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দিতে পারে এবং আগের মতো অনেক কাজ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে এ সময় মানুষ জীবনের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। তখন দৃষ্টিভঙ্গি গভীর হয়, অগ্রাধিকারের তালিকা বদলে যায় এবং পার্থিব ব্যস্ততার চেয়ে আখেরাতের প্রস্তুতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বার্ধক্যের একটি বড় শিক্ষা হলো, মানুষকে তার নিয়ন্ত্রণের সীমা বুঝতে শেখানো। পৃথিবীর সব ঘটনা, মানুষের আচরণ বা বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের হাতে নেই। কিন্তু নিজের চরিত্র, ইবাদত, ধৈর্য, দয়া ও আচরণ আমাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। তাই বয়সের শেষভাগে একজন মানুষ নিজের আত্মশুদ্ধি, পরিবারকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।

প্রবীণদের অবদান সুদূরপ্রসারী। পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, পরামর্শ প্রদান, আন্তরিকভাবে কারও জন্য দোয়া করা, এসব কাজ মানুষের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইসলামের ইতিহাসেও আমরা বার্ধক্যের প্রজ্ঞার অসাধারণ উদাহরণ দেখি। হজরত সালমান ফারসি (রা.) তেমনই একজন প্রবীণ সাহাবি। খন্দকের যুদ্ধে মদিনা আক্রমণের জন্য মক্কার কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা অবরোধ করেছিল। তখন সালমান ফারসি (রা.) মদিনার অরক্ষিত উত্তর প্রান্তে পরিখা (খন্দক) খননের পরামর্শ দেন। তার এই কৌশলগত দূরদর্শিতার ফলেই মদিনা শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং মদিনাবাসীরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়। প্রকৃতপক্ষে বার্ধক্যের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে জীবনের অভিজ্ঞতাকে প্রজ্ঞায়, কষ্টকে ধৈর্যে এবং সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগে রূপান্তরিত করার মধ্যে। শারীরিক শক্তি ক্ষয় হতে পারে, কিন্তু আত্মার বিকাশের সম্ভাবনা কখনো শেষ হয় না। তাই বয়স বাড়া মানে শুধু জীবনের বছর বৃদ্ধি নয়, বরং প্রতিটি বছরকে অর্থবহ, কল্যাণময় ও আখেরাতমুখী করে তোলা। এটাই বার্ধক্যের প্রকৃত সৌন্দর্য।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত