অতিথিপরায়ণতা মহৎ গুণ। ইসলাম অতিথিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশেষ নেয়ামত হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তাই অতিথিকে সম্মান করা, তার আরাম-আয়েশের খেয়াল রাখা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করা মুমিনের চরিত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। মেহমানদারির মধ্য দিয়ে যেমন মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জন্ম নেয়, তেমনি অর্জিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অফুরন্ত বরকত। অতিথিপরায়ণতা এমন এক গুণ, যা ইমান, উদারতা ও মহান চরিত্রের উজ্জ্বল প্রকাশ।
মেহমানদারির ফজিলতের বিষয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দয়াময় রহমানের ইবাদত করো, মানুষকে খাবার খাওয়াও এবং সালামের অধিক প্রচলন ঘটাও, তবেই নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।’ (তিরমিজি)
অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামে কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, ‘তুমি অপরকে খাবার খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেবে।’ (সহিহ বুখারি) এ হাদিসে রাতের আঁধারে ঘুম থেকে ওঠে তাহাজ্জুদ আদায় করাকে ইসলামের সর্বোত্তম আমল বলা হয়নি। সর্বোত্তম আমল বলা হয়নি প্রতিদিন নফল রোজা পালন করাকে। বরং এমন দুটি কাজকে ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম আমল বলা হয়েছে, যেটা পালন করা একেবারেই সহজসাধ্য ব্যাপার। আর তা হচ্ছে, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো এবং একে অপরকে সালাম প্রদান করা।
আখেরাতে যারা চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতের অধিকারী হবেন, দুনিয়াতে তাদের মহৎ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা অতিথিপরায়ণ হবেন এবং দুর্বল, নিঃস্ব-অসহায়, অনাহারীকে নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে খাবার খাওয়াবেন। কিন্তু আমরা অনেকেই দুর্বল, নিঃস্ব-অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অথবা সমাজে যশ-খ্যাতি অর্জনের লক্ষ্যে। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, অনাহারীদের আহারের ব্যবস্থা করা যদি হয় নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে, তবে শত শত অনাহারীকে খাদ্যদানে কোনোই ফায়দা হাসিল হবে না। এ জন্য ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা জান্নাতি হবে তারা খাদ্যের প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাবার দান করে এবং তারা বলে, শুধু আল্লাহর সস্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদের খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না, চাই না কোনো কৃতজ্ঞতাও।’ (সুরা দাহর ৮-৯)
মেহমানদারি করা যদিও ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম নেক আমল বলা হয়েছে, তবুও আমরা অনেকেই দুনিয়ার সাময়িক আর্থিক লোকসানের কথা ভেবে আখেরাতের চিরস্থায়ী লাভের কথা ভুলে গিয়ে মেহমানদারি করতে খুবই কৃপণতা ও কুণ্ঠাবোধ করি। অথচ আল্লাহ যাদের কল্যাণ চান, তাদের ঘরে একজন মেহমান পাঠিয়ে দেন। সুতরাং যে ব্যক্তি চায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে, সে যেন মেহমানকে সমাদর করার মাধ্যমে সন্তুষ্ট রাখে। কেননা মেহমানের সন্তুষ্টি অর্জনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নামান্তর।
এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং আখেরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি) এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ওপর এবং আখেরাত দিনের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হলে অবশ্যই মেহমানকে কদর করতে হবে।
মেহমানকে দুভাবে সম্মানিত করা যায়। সুন্দর রুচিশীল খাবার মেহমানের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এবং মেহমানের সঙ্গে সুন্দর আচার-আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে। এই দুটির যেকোনো একটির অভাব হলে মেহমানদারির মর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মেজবানের উচিত, মেহমানের হক আদায় করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা। মেজবানের ওপর মেহমানের হক সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে তার প্রাপ্যের বিষয়ে। জিজ্ঞেস করা হলো, মেহমানের প্রাপ্য কী, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, মেহমানের প্রাপ্য হচ্ছে এক দিন একরাত ভালোভাবে মেহমানদারি করা। তিন দিন হলে সাধারণ মেহমানদারি করা। আর তার চেয়েও অধিক হলে মেহমানের প্রতি দয়া করা।’ (সহিহ বুখারি)
সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে মেহমানদের সমাদর করতেন এবং কীভাবে মেহমানের হক আদায় করতেন, সেই ব্যাপারে একটি চমৎকার ঘটনা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক লোক নবিজি (সা.)-এর খেদমতে এলো। অতঃপর রাসুল (সা.) তার স্ত্রীদের কাছে খাবারের জন্য একজন লোক পাঠালেন। তারা জানালেন, আমাদের কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন রাসুল (সা.) বললেন, কে আছো যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সঙ্গে খাওয়াতে পারো? তখন এক আনসার সাহাবি (আবু তালহা রা.) বললেন, আমি আছি হে আল্লাহর রাসুল! এ বলে তিনি মেহমানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসুল (সা.)-এর মেহমানকে যথাযথ সম্মান করো। স্ত্রী বললেন, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসার সাহাবি বললেন, তুমি আহার প্রস্তুত করো, বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদের ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল তা মেহমানের সামনে উপস্থিত করল। বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মতো শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে লাগলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। মেহমানকে সন্তুষ্ট রাখতে তারা উভয়েই সারারাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলেন, তখন রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কাজ দেখে খুশি হয়েছেন এবং (সুরা হাশরের) এই আয়াত নাজিল করেছেন, ‘তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদের অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।’ (সহিহ বুখারি)
লেখক : ইসলামি গবেষক
