অন্যের দোষ চর্চা ও রুমির দর্শন

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:২০ এএম

পরনিন্দা ও অন্যের দোষ অনুসন্ধান করা মানুষের অন্তরের অন্যতম মারাত্মক ব্যাধি। সমাজ জীবনে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষ নিজের পাহাড়সম দোষ-ত্রুটি ভুলে অন্যের সামান্যতম ত্রুটি নিয়ে মেতে ওঠে। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) তার রচিত মসনবী শরিফে মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক রোগ এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ঐশ^রিক হেকমতের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, অন্যের সমালোচনা করার স্বভাবটি মানুষের আধ্যাত্মিক পতন এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির স্পষ্ট লক্ষণ। নিজের পাপাচার আড়াল করা আর অন্যের পাপাচার নিয়ে মুখর হওয়ার পেছনে যে ঐশ্বরিক ফয়সালা কাজ করে, রুমি তা কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মসনবী শরিফের প্রথম খণ্ডের ২২৫ ও ২২৬ নম্বর শ্লোকে মাওলানা রুমি লিখেছেন, ‘চু খোদা খাহাদ কে পর্দাহ কাসে দারাদ্/ মেইলাশ আন্দার ত’নাহ পাকান বারাদ্/ ওয়ার খোদা খাহাদ কেহ পুশাদ আইবে কাস/ কাম যানাদ্ দার আইবে মা’উবান নাফাস।’

অর্থ : আল্লাহ যখন কারও পাপের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে তাকে লজ্জিত করতে চান, তখন তার মনকে পবিত্র ও নেককার মানুষের প্রতি খোঁটা বা দোষারোপের দিকে ঝুঁকিয়ে দেন। আর আল্লাহ যখন কারও দোষ-ত্রুটি গোপন রেখে তাকে সুরক্ষিত রাখতে চান, তখন সে ব্যক্তি অন্য কোনো দোষী মানুষের দোষ চর্চায় নিজের নিঃশ্বাস ব্যয় করে না অর্থাৎ মুখ বন্ধ রাখে।

মাওলানা রুমির এই দর্শনের গভীরতা অপরিসীম। তিনি বুঝিয়েছেন, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের সংশোধন না করে সমাজের ভালো ও সৎ মানুষদের পেছনে লাগে, তাদের চরিত্রে কালিমালেপন করতে চায়, তখন বুঝতে হবে এটি তার ওপর আল্লাহর এক প্রকার শাস্তি। আল্লাহ তার হেদায়েতের তৌফিক ছিনিয়ে নিয়েছেন বলেই সে পুণ্যবানদের নিন্দায় মত্ত হয়েছে। এই নিন্দার পথ ধরেই একসময় সমাজে তার নিজের গোপন অপরাধগুলো প্রকাশ পেয়ে যায় এবং সে চরম লাঞ্ছিত হয়। পক্ষান্তরে, কোনো গুনাহগার ব্যক্তি যদি নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখে এবং অন্যের ত্রুটি দেখেও তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে, তবে বুঝতে হবে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ তার ওপর রয়েছে। আল্লাহ চান না তার বান্দা অপমানিত হোক, তাই আল্লাহ তার নিজের দোষগুলোও মানুষের চোখ থেকে আড়াল করে রাখেন।

রুমির এই আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কোরআন-হাদিসের অমিয় বাণী। বিশেষ করে নবীজির হাদিস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এ কাব্য রচনা করেছেন। আবু দাউদ শরিফের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করবেন, তাকে তার ঘরের ভেতরেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবেন। অন্যদিকে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, যে বান্দা দুনিয়াতে অন্য বান্দার দোষ গোপন রাখবে, কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত