সামাজিক মাধ্যমে বট আইডি (গুপ্ত আইডি), গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধানও আইনে আনা হবে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে একথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খান তার বক্তব্যে বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠিত বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে সরকারপ্রধান, তার স্ত্রী ও কন্যাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, সেটা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।’
সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, অপমানকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া করা হচ্ছে। আমরা একে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত করব। এর কতিপয় বিধান সংশোধন করব। তিনি বলেন, গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধানও আইনে যুক্ত করা হবে।
সম্পূরক প্রশ্নে হেলেন জেরিন খান জানতে চান, মেটাসহ আন্তর্জাতিক সামাজিক মাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের আইনে এখনো এমন বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা যায়। নতুন সংশোধনে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়া কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার বিধান থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা ও বিটিআরসিসহ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও এ ধরনের কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুয়া প্রতিরোধ আইন ফাইনাল স্টেজে আছে। আশা করছি সংসদের এই সেশনে আইনটা আনতে পারব। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্গানাইজেশন করার জন্য আইনি প্রস্তাবগুলো আনব।
মোবাইলের স্ক্রিন থেকে শিশুদের মাঠে ফেরানোর দাবি : ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরে বন্দি শিশু-কিশোরদের মোবাইলের পর্দা থেকে বের করে খেলার মাঠের মুক্ত বাতাসে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি ওঠে সংসদে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলো দখলদার এবং মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ করার আশ্বাস দিয়েছেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির বক্তব্যের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানান, মাঠ ও পার্কগুলো পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার বদ্ধপরিকর এবং এরই মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
নিলুফার চৌধুরী মনি দেশের খেলার মাঠগুলোর বেহাল ও আশঙ্কাজনক চিত্র সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের পার্ক ও খেলার মাঠ একসময় শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর বয়স্কদের অবসরের জায়গা ছিল। কিন্তু এখন অনেক মাঠ ও পার্ক মাদক কারবারি, বখাটে ও অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কোথাও শিশু পার্কের নামে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে, কোথাও হাট-বাজার বসিয়ে মাঠের অস্তিত্ব সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে নিরাপদ পরিবেশের অভাবে শিশুরা মাঠ ছেড়ে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নিচ্ছে।
খেলার মাঠকে নগরের ‘ফুসফুস’ উল্লেখ করে সরকারি দলের এ সদস্য বলেন, ঢাকা সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারে মাত্র ৪২টি মাঠ। বাকি মাঠগুলোর বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ধূপখোলা মাঠ, শ্যামলী মাঠ এবং মিরপুরের কয়েকটি মাঠে নিয়মিত বাজার বসিয়ে খেলার পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকায় ১২৬টি মাঠ হারিয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ পরিবেশে গড়ে তুলতে মাঠ ও পার্ক রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, উত্থাপিত তথ্যের বেশিরভাগই সত্য। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বহু মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান দখল করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেগুলো উদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে। গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্ককে হকার ও অপরাধীদের দখলমুক্ত করে আধুনিক পার্কে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া মতিঝিল পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসুলবাগ মাঠ, খিলগাঁও-বাসাবো মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, হাজারীবাগ পার্ক ও আমলীগোলা খেলার মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে উন্নয়নকাজ চলমান।
মন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৮টি মাঠ ও পার্ক আধুনিকায়ন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকাতেও নতুন মাঠ ও পার্ক নির্মাণ এবং সংস্কার কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইন্টার-স্কুল ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার চর্চা বেড়েছে।
পরে সম্পূরক প্রশ্নে নিলুফার চৌধুরী মনি মাঠ ও পার্কে মাদকসেবীদের বিচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানতে চান, শিশু-কিশোরদের মাদকের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, দেশের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যাধি মাদক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে মাঠ ও পার্কগুলো আরও নিরাপদ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে।
ক্রয় আইন বা পিপিআর পর্যালোচনার আশ্বাস : ঠিকাদারদের কাজ হাতবদল ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিন। অন্য জেলা বা বিভাগের বড় ঠিকাদাররা কাগজে-কলমে শক্তিশালী প্রোফাইল দেখিয়ে কাজ বাগিয়ে নিলেও পরে তা স্থানীয় অযোগ্যদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। সংসদ সদস্যের এমন গুরুতর সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সংকট রুখতে বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর ই-জিপির ফাঁকফোকর ও অতীতের অনিয়ম নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার, যাদের প্রোফাইল কাগজে-কলমে অনেক শক্তিশালী, তারা ই-জিপির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাজগুলো সহজে পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা নিজেরা মাঠে কাজ না করে পর্দার আড়ালে থেকে স্থানীয় অযোগ্য লোকদের কাছে কাজগুলো কয়েক দফায় বিক্রি বা হাতবদল করছেন। দাম কমে যাওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই স্থানীয় পর্যায়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী খোদ সংসদ সদস্যরা। এই অনিয়ম রুখতে এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ঠিকাদারি পদ্ধতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চান তিনি।
সংসদ সদস্যদের এই উদ্বেগের সঙ্গে শতভাগ একমত পোষণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব সমস্যা ও ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার পুরোপুরি অবগত আছে। এই ক্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও কাজের ক্ষতিকর হাতবদল ঠেকাতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সঠিক ও যোগ্য স্থানীয় ঠিকাদাররা যাতে যথাযথভাবে কাজ পান এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর মান বজায় থাকে, সেজন্য বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর কীভাবে রিভিউ বা সংশোধন করা যায়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।