গত ১৮ মে রাত ১০টায় রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেট মসজিদসংলগ্ন সড়কের ঘটনা। এক ব্যক্তিকে ঘিরে শাসাচ্ছে কয়েকজন উঠতি তরুণ। তাদের চোখে-মুখে উগ্রতা, এবড়ো-থেবড়ো চুলের কাটিং, হাতে স্টিলের ব্রেসলেট, কারও কারও চোখে কালো সানগ্লাস, পরনে নানা জায়গায় ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট। দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না এরা সবাই কিশোর গ্যাং সদস্য।
এরা দোলাইরপাড় ঢাল দিয়ে কুতুবখালী হয়ে যাত্রাবাড়ী গোল চত্বরে যাওয়া পণ্যবাহী ট্রাকের মালামাল হরহামেশাই ছিনতাই করে। চক্রের দুই সদস্য সেদিন ট্রাকের পেছন দিয়ে উপরে উঠে তরকারির বস্তা ছিনতাই করছিল। চালক-হেলপার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ট্রাক থামিয়ে এদের ধরতে যান। তখনই আশপাশে থাকা চক্রের অন্য সদস্যরা মিলে চালক-হেলপারকে শাসাতে শুরু করে। ততক্ষণে ওই ট্রাকের কারণে সড়কটিতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অন্য পরিবহন চালকদের পীড়াপীড়িতে চালক দ্রুত ট্রাকটি চালিয়ে চলে যান। তবে হেলপার ইয়ামিনকে ট্রাকে উঠতে দেয়নি গ্যাং সদস্যরা। পাশের একটি গলির মুখে নিয়ে তাকে অনবরত মানসিকভাবে চাপ দিতে থাকে। লোকজন জড়ো হলে ‘নিজেদের বিষয়’ বলে সবাইকে সরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে ইয়ামিনের পকেট থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জানতে চাইলে ঘটনার বিস্তারিত জানান ভুক্তভোগী ইয়ামিন। কোনো আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না জানতে চাইলে বলেন ‘কী হবে থানায় গিয়ে। ১ হাজার ৮০০ টাকার জন্য আবার মামলা করব? আপনারা তো দেখেছেন, আমাদের মালামাল নিয়ে যাচ্ছিল। বাধা দেওয়ায় উল্টো আমাদের হেনস্তা করেছে, টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ ঘটনায় জড়িতরা স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘কামরুল বাহিনী’র সদস্য। কামরুল হাসান ওরফে পলাশের নেতৃত্বে ওই এলাকায় ভোররাতে ছিনতাই, মসজিদসংলগ্ন গলি ও আশপাশের সিএনজি গ্যারেজে মাদক বিক্রি হয়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে চেকপোস্টে ব্যাগ তল্লাশির সময় কনস্টেবল শাহ আলমকে ছুরিকাঘাত করে ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায় কয়েকজন। ঘটনার তিন মাসেও জড়িত কাউকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেপ্তার করছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। ঢাকা শহরকে অপরাধমুক্ত করতে, এদের লাগাম টেনে ধরতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে কামরুল বাহিনীর মতো ঢাকায় অন্তত ১৪৩টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব বাহিনীর সদস্যরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলে সহায়তা, ইন্টারনেট সংযোগ, ক্যাবল টিভি (ডিশ) ব্যবসা ও ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, উত্ত্যক্ত করা, যৌন হয়রানি করা, হামলা, মারধরসহ নানা অপরাধে জড়িত। নামে কিশোর গ্যাং হলেও বেশিরভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের বেশি। এদের কেউ কেউ গাড়ির হেলপার, গ্যারেজ মিস্ত্রি, দোকানের কর্মচারী, নির্মাণ শ্রমিক, ভাঙারি পণ্যের ক্রেতা, সবজি বিক্রেতা। আধিপত্য বজায় রাখতে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ায় এরা। এহেন কর্মকা-ে নিরুপায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। প্রতিনিয়ত অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা দিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না গ্যাং বাহিনীর। জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপকর্মে যুক্ত হচ্ছে তারা। এক সময় ভাসমান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা কিশোর গ্যাং চক্রে নাম লেখালেও সাম্প্রতিককালে প্রভাবশালী পরিবার, ধনীর দুলালরাও গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে বলে সরেজমিন অনুসন্ধান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ১৪৩ গ্রুপের প্রতিটিতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন করে সদস্য রয়েছে। সে হিসাবে খোদ রাজধানীতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আড়াই হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য। রমনা বিভাগে খোঁজ মিলেছে ৯টি গ্রুপের, লালবাগ বিভাগে ১৩টি, মতিঝিল বিভাগে ১৪টি, তেজগাঁও বিভাগে ২৯টি, মিরপুর বিভাগে ৩৪টি, ওয়ারী বিভাগে ১৭টি, গুলশান বিভাগে ১৩টি এবং উত্তরা বিভাগে ১৪টি। সবচেয়ে বেশি গ্যাং গ্রুপ রয়েছে মিরপুর বিভাগের সাত থানা এলাকায়। এই বিভাগে ৩৪টি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় সর্বাধিক ১৪টি গ্রুপ সক্রিয়। মিরপুরের পরই তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানা এলাকায় ২৯টি গ্রুপ সক্রিয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়ই সর্বাধিক ১৬টি গ্রুপ সক্রিয়। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় রাজধানীতে এই গ্যাং গ্রুপের সংখ্যা ১১৮টি।
এলাকাভেদে চটকদার নামে গ্যাং : বাহারি ও চটকদার নামে রাজধানীর আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে গ্যাং গ্রুপ। ওই নামে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আইডিও খোলা হয়। যেমন মোহাম্মদপুর এলাকায় ১৬টি গ্যাং গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্রুপগুলো হলো ডাইল্লা গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, স্টার বন্ড, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, ভাইব্বা ল কিং গ্রুপ, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল গ্রুপ ও ঘুটা দে গ্রুপ। উত্তরার আজমপুর, আব্দুল্লাহপুর, বড়বাগ, জসিমউদ্দিন, ময়লার মোড় ও সেক্টর ১৪-তে বিগ বস, পিকে গ্রুপ, চাপাতি সুমন গ্রুপ, ফার্স্ট হিটার বয়েজ, এফএইচবি গ্রুপ, হামজা বিল্লাহ গ্রুপ, বুলেট গ্রুপ, নাইন স্টার গ্রুপ এবং ডিস্কো বয়েজসহ ১৪টি গ্রুপ রয়েছে। মিরপুর বিভাগে রিংকু গ্রুপ, অনিক গ্রুপ, আশিক গ্রুপ, পিন্টু-কালু গ্রুপ, পল্লবী ও কালশীতে তোমাদের আরিফ ভাইয়া গ্রুপ, সুমন গ্যাং, রকি গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, পিয়াস গ্রুপ, পিচ্চি বাবু, বিহারি রাসেল গ্যাং, মুসা-হারুন গ্রুপ, বিচ্ছু বাহিনী, সায়েফ ও সাব্বির গ্যাং, নয়ন গ্যাং, মোবারক গ্যাং। মিরপুর ১০-এ ‘বাহুবলী গ্রুপ’ জনমনে আতঙ্কের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ওয়ারীতে মোল্লা ও সোনা নামে দুটি গ্যাং বাহিনী রয়েছে। শনিরআখড়ায় রাব্বির নেতৃত্বে টপবাজ গ্রুপ, ইউনুফের গ্যাংস্টার প্যারাডাইস, সাইফুলের বয়েজ হাই ভোল্টেজ, যাত্রাবাড়ীতে মাইদুলের দে-দৌড় গ্রুপ, শাহাদাতের হ্যাঁচকা টান, শ্যামপুর, কদমতলীতে রকি গ্রুপ, মাতুয়াইল-ডেমরা এলাকায় অনিক-শাকিব গ্রুপ সক্রিয়। লালবাগের আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড, পলাশী মোড়, কেল্লার মোড়, পোস্তা, মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার, সেকশন ও শহীদনগরের অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আকাশ গ্রুপ, সামী গ্রুপ, ০০৭ (জিরো জিরো সেভেন) গ্রুপ, বাবা গ্রুপ, জাউরা গ্রুপ, ডি কোম্পানি এবং জাহাঙ্গীর গ্রুপ। মতিঝিল এজিবি কলোনি এলাকায় বিচ্ছু বাহিনী, নিবিড় গ্রুপ, মুগদায় চাঁন-জাদু গ্রুপ, ব্যান্ডেজ গ্রুপ, বংশাল, গুলিস্তানে হৃদয় গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। শাহজাহানপুর ও সবুজবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী মুন্না ও হাসানের নেতৃত্বে চলে দুটি গ্রুপ। অভিজাত এলাকা গুলশানে ডি-৩, সেভেন স্টার, বাড্ডায় সিয়াম ওরফে বার্গার সিয়াম গ্রুপ, স্বাধীন গ্রুপ, খিলক্ষেতের বনরূপা, নামাপাড়া, পাতিরা এলাকায় সক্রিয় ডেঞ্জার গ্রুপ, পিনিক গ্রুপ ও কিং মাস্টার গ্রুপ। এ ছাড়া আরও একাধিক গ্রুপ রয়েছে। ঢাকার নিকটবর্তী উপ-শহরে, গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে গ্যাং গ্রুপ।
৭৮ গ্রুপে ধনীর দুলালরা : প্রভাবশালী পরিবার, ব্যবসায়ী, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনীর দুলালরাও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের পোশাক, চুলের কাটিং, চলাফেরা সবই ভীতিকর। এরা প্রথমে মাদক সেবন, পরবর্তীতে মাদক বিক্রিতেও জড়িয়ে যাচ্ছে। ব্র্যান্ডেড পোশাক পরে দামি গাড়ি, বাইকে অবৈধ সাইরেন-হুটার বাজিয়ে আইনের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে অভিজাত এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ‘শ্যাডো’ বা গ্যাং কালচারের ভিডিও শেয়ার করে জানান দিয়েই করছে এসব অপকর্ম।
গত ২৬ মার্চ যাত্রাবাড়ীর উত্তর কুতুবখালী খাল থেকে সিদ্ধেশ্বরী কলেজ ছাত্র সাদমান সাইফ রাইভির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার আগের দিন অভিযুক্ত চারজন এবং ভিকটিম রাইভি একটি বাসার ছাদে পার্টিতে অংশগ্রহণ করে। ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত জুবায়ের অস্ট্রেলিয়ায় চলে যায়। এলাকাবাসী জানান, জুবায়েরের বাবা বড় ব্যবসায়ী। উত্তর কুতুবখালীতে রয়েছে নিজস্ব বাড়ি। অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রায়ই দেশে এসে জুবায়ের জড়ায় নানা অপকর্মে। মাদকের মধ্যে ডুবে থাকে সারাক্ষণ। হরেক রকমের মাদকের পেছনে দুই হাতে টাকা ছড়ায়।
উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার আলফাজ মিয়া ওরফে শিশির চলে দামি প্রাইভেটকারে। তার বাবা একজন আমদানিকারক। কিন্তু শিশির জড়িয়ে পড়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপে। জুবায়ের ও শিশিরের মতো প্রভাবশালী, ব্যবসায়ী ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন অনেক সন্তান গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে। ৭৮টি গ্রুপে অন্তত ২-৪ জন করে সদস্যের তথ্য পাওয়া গেছে, যারা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।
কয়েকটি ঘটনা : গত ১৪ মে লালবাগের শহীদনগরে টি-শার্ট বিক্রেতা রাফি হোসাইনকে গুলি করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ তারিখে মারা যান তিনি। এলাকার মাদক কারবারি মনিরের সঙ্গে বিরোধের জেরে তার সহযোগীরা রাফিকে গুলি করে হত্যা করে। ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর এমনটি জানিয়েছে পুলিশ। ওই এলাকায় ২৪ মে রাতে কিশোর গ্যাং সদস্য উদয়, নিলয় ও হৃদয় কুপিয়ে জখম করেছে শ্রমিক দলের লালবাগ থানা সদস্য সচিব নুরুদ্দিন মিন্টু ও তার ছেলে ওমরকে। মাদক ব্যবসা নিয়ে কথা বলায় গ্যাং সদস্যরা ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে আক্রান্তদের পরিবার। ২৬ ফেব্রুয়ারি তুরাগে ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা দখলে নিতে স্থানীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন মিয়ার প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং গ্রুপ। দুই গ্যাং গ্রুপের দ্বন্দ্বে বাড্ডায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে অন্য গ্রুপের সৈয়দ মোহাম্মদ তানভিরকে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাং গ্রুপের ভয়ংকর তা-ব সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ রকম অহরহ খুনখারাবি, অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। গত বছর রাজধানীতে যত খুন হয়েছে, তাতে অন্তত ২৩টি কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট।
আগামীকাল : শেল্টারে ১০ রাজনৈতিক নেতা, ৪ শীর্ষ সন্ত্রাসী