কয়েক সপ্তাহ আগেও তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল পরের বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে? ক্ষুধা লাগলে তারা হাতে একটি খালি প্লেট নিয়ে গিয়ে বসে থাকতেন মায়ের সমাধিস্থলের পাশে। প্রতিবেশীরা কেউ খাবার দিলে খেতেন, না দিলে উপোসেই কাটত দিন। আজ সেই তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের নামে ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮১ টাকা। ব্যাগভর্তি বাজার ও বস্তাভর্তি চাল, সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানবিক সহায়তায় বদলে যেতে শুরু করেছে তাদের জীবনের গল্প।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া ইউনিয়নের চাঁদকাঠি গ্রামের দাসনগর এলাকার বাসিন্দা রিপন দাস, সাধু দাস ও নিধু দাস। তিনজনই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। সাধু দাস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আর রিপন ও নিধু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। নিজেদের কষ্টের কথাও তারা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারেন না। একসময় বাবা রতন চন্দ্র দাস ও মা সরস্বতী রানীর স্নেহ-ভালোবাসায় কোনোভাবে চলছিল তাদের জীবন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন বাবা-মা। গত বছর মারা যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রতন চন্দ্র দাস। এরপর অসুস্থ শরীর নিয়ে তিন সন্তানকে আগলে রাখেন মা সরস্বতী রানী। মায়ের মৃত্যুর পর কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে পরিবারটি।
এরপর দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে তাদের মানবেতর জীবনের গল্প। বিশেষ করে ক্ষুধা লাগলে মায়ের সমাধিস্থলের পাশে খালি প্লেট হাতে বসে থাকার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
দেশজুড়ে মানবতার সাড়া : প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
সহায়তার অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা অমিত দাস বলেন, প্রতিবেদন প্রচারের আগে প্রায় ২ লাখ টাকা সহায়তা জমা হয়েছিল। পরে দুই দিনের মধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সাহায্য পাঠাতে শুরু করেন। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮১ টাকা জমা হয়েছে।’
তিনি জানান, সহায়তার টাকা যাতে নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায় এবং ভবিষ্যতে তিন ভাইয়ের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
এক মাসের বেতন দিলেন সংসদ সদস্য : তিন ভাইয়ের দুর্দশার খবর নজরে আসার পর পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ তাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি নিজের এক মাসের সংসদ সদস্যের বেতন বাবদ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিবারটির জন্য প্রদান করেন।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘চাদকাঠি গ্রামের এই তিন প্রতিবন্ধী ভাই আমাদের সমাজেরই অংশ। আল্লাহ যতদিন তাদের হায়াত দিয়েছেন, ততদিন আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, তাদের জীবনকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল করার জন্যও কাজ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের জন্য একটি আলাদা তহবিল গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থার বিষয়েও আমরা চিন্তা করছি।’
বিএনপির সহায়তা : বাউফল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সামুয়েল আহমেদ লেনিন বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং বাউফল উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের এক মাসের বাজারের ব্যবস্থা করেছি। ভবিষ্যতেও তাদের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
কুষ্টিয়া থেকে এগিয়ে এলেন সজল কুমার :
তিন ভাইয়ের গল্প শুধু বাউফলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কুষ্টিয়া থেকেও এগিয়ে এসেছেন মানবিক মানুষ। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা সজল কুমার বলেন, ‘প্রতিবেদনটি দেখার পর আমি আমার ফেসবুকে একটি পোস্ট করি। সেখান থেকে মানুষ সাহায্য পাঠাতে শুরু করেন। সব মিলিয়ে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮১ টাকা সংগ্রহ হয়। আমি পুরো টাকাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের নতুন ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়েছি।’
যেভাবে খরচ হবে অর্থ : বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালেহ আহমদ জানান, তিন ভাইয়ের উপস্থিতিতে অগ্রণী ব্যাংক বাউফল শাখায় একটি বিশেষ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সমাজসেবা কর্মকর্তার অনুমোদন থাকবে, যাতে অর্থের অপব্যবহার না হয় এবং ভবিষ্যতে তিন ভাইয়ের জীবনযাপন, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘তাদের সুস্থ ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জরুরি চিকিৎসা, বাসস্থান, প্রয়োজনীয় ব্যয় বা অন্য কোনো যৌক্তিক প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলন করা যাবে। এ ছাড়া ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের মুনাফার একটি অংশ নিয়মিতভাবে তাদের জীবনযাপনের ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে।’
নতুন আশার গল্প : কয়েক সপ্তাহ আগেও যারা খাবারের জন্য অন্যের দ্বারে দ্বারে তাকিয়ে থাকতেন, আজ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী সঞ্চিতা পাল বলেন, ‘আমরা অনেক সময় খাবার দিয়ে সাহায্য করেছি। কিন্তু সব সময় তো পারিনি। এখন মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে ওদের জীবনটা একটু ভালো হবে।’ প্রতিবেশী দীপক রায় বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর ওরা একেবারে অসহায় হয়ে গিয়েছিল। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সাহায্য করায় আমরা স্বস্তি পাচ্ছি।’
একটি খালি প্লেট, একটি সমাধিস্থল আর তিন অসহায় ভাইয়ের গল্প হয়তো শুধু একটি পরিবারের কষ্টের গল্প ছিল। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও মানবিকতার স্পর্শে সেই গল্প এখন হয়ে উঠেছে আশার গল্প। যে গল্প মনে করিয়ে দেয় সমাজ এখনও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে।