সাক্ষাৎকারে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট

টেকসই নগরায়ণের জন্য দরকার প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

বাংলাদেশে একশরও বেশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বহুমুখী শিক্ষায়তনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণ, আবাসন, নগর উন্নয়ন এবং অবকাঠামোবিষয়ক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতের জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। এ বাস্তবতায় দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ রিহ্যাব সদস্যরা উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী ও স্থপতিদের সম্মিলিত উদ্যোগে রিহ্যাব ইউনিভার্সিটি অব বিল্ডিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আরইউবিটি) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে। এটি কোনো ব্যক্তি উদ্যোগ নয়, বরং দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।

সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল দেশ রূপান্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

দেশ রূপান্তর : দেশে একশটিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। নতুন করে রিহ্যাব ইউনিভার্সিটি অব বিল্ডিং অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিল কেন?

ড. আলী আফজাল : দেশে সরকারি ও বেসরকারি শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় একই ধরনের বিষয় পড়ায়, গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। রিহ্যাব ইউনিভার্সিটি অব বিল্ডিং অ্যান্ড টেকনোলজি প্রচলিত ধারার আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে চায় না। আমরা একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে

চাই, যার মূল ফোকাস হবে বিল্ডিং টেকনোলজি, রিয়েল এস্টেট, স্মার্ট সিটি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, টেকসই নগরায়ণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নির্মাণ খাত। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশে গৃহায়ন ও আবাসন খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনো সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে চাই।

দেশ রূপান্তর : এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন কী?

ড. আফজাল : শুধু ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী তৈরি করা আমাদের ভিশন নয়। আমরা ভবিষ্যতের উদ্ভাবক, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ এবং জাতি গঠনের নেতৃত্ব তৈরির স্বপ্ন দেখি। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বই পড়ে পরীক্ষায় পাস করবে না; তারা নতুন চিন্তা করবে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে এবং নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা বাংলাদেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নির্মাণ খাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটির আলাদা সত্তা কী হবে?

ড. আফজাল : প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল আমরা অনুসরণ করতে চাই না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা চার বছর পড়াশোনা করে একটি সনদ নিয়ে বের হন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ঢোকার পর দেখা যায়, তাদের দক্ষতায় অনেক ঘাটতি। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং গবেষণাধর্মী। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে পাঠের সঙ্গে বাস্তব প্রকল্প, নির্মাণস্থান, গবেষণাগার, প্রযুক্তিকেন্দ্র এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাবেন। আমরা শুধু সনদধারী শিক্ষার্থী চাই না বরং তারা দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বের হয়ে আসুক সেটা চাই।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ফোকাস কী হবে?

ড. আফজাল : আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়সমূহ হবে যুগোপযোগী ও ভবিষ্যৎমুখী। বিল্ডিং টেকনোলজি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারিং, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, স্মার্ট সিটি প্ল্যানিং, সাসটেইনেবল কনস্ট্রাকশন টেকনোলজি, আরবান ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, গ্রিন বিল্ডিং টেকনোলজি, কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালস ইনোভেশন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন কনস্ট্রাকশন, ডিজিটাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড টেকনোলজি ও ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মতো অনেক বিষয় বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হলেও বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ানো হয় না। আমরা এগুলোয় জোর দিতে চাই।

দেশ রূপান্তর : এ সব বিষয় পড়ে শিক্ষার্থীরা কী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য প্রস্তুত হবে?

ড. আফজাল : আমরা চাই না, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী হয়ে গড়ে উঠুক। আমরা চাই তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা হয়ে উঠুক। আজকের বিশ্বে যে দেশ নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম সে দেশই নেতৃত্ব দেয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে নতুন নির্মাণপ্রযুক্তি, নতুন নির্মাণ উপকরণ, নতুন অবকাঠামোগত সমাধান এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল উদ্ভাবনে সক্ষম করে গড়ে তোলা হবে।

দেশ রূপান্তর : গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কী?

ড. আফজাল : গবেষণা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার না করে নিজেরাই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করুক। বাংলাদেশের জলবায়ু, ভৌগোলিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নতুন নির্মাণপ্রযুক্তি, সাশ্রয়ী আবাসন কাঠামো, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। আমরা চাই, আরইউবিটি দক্ষিণ এশিয়ার নির্মাণপ্রযুক্তি গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠুক।

দেশ রূপান্তর : দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমাতে এ বিশ্ববিদ্যালয় কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?

ড. আফজাল : বাংলাদেশে অনেক বড় প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। আমরা তাদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করি। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর। এখনই আমাদের নিজেদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা এমন প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং নির্মাণবিশেষজ্ঞ তৈরি করতে চাই যারা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের বড় বড় প্রকল্পগুলো সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে; আবার বিদেশে গিয়ে রেমিট্যান্স আহরণ করতে পারবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং দেশীয় দক্ষতার বিকাশ ঘটবে।

দেশ রূপান্তর : এটি কি কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ? রিহ্যাবের উদ্দেশ্য কী?

ড. আফজাল: এটি কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়। রিহ্যাব দেশের আবাসন খাতের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা একটি ট্রাস্ট গঠন করে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে চাই, যাতে এটি ব্যক্তিস্বার্থে নয় বরং জাতীয় স্বার্থে পরিচালিত হয়। আমাদের বিশ্বাস, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শত বছরের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া যায়।

দেশ রূপান্তর : সরকারের কাছে আপনাদের আশা কী?

ড. আফজাল : এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত অনুমোদন, নীতিগত সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা কামনা করছি। কারণ এ উদ্যোগ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের নির্মাণ, আবাসন এবং অবকাঠামো খাতের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি জাতীয় প্রকল্প। সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারব।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আপনি কী বার্তা দিতে চান?

ড. আফজাল : আমরা ভবন নির্মাণ করি, নগর গড়ি, অবকাঠামো নির্মাণ করি কিন্তু একজন দক্ষ নাগরিক তৈরি করা তার চেয়েও বড় কাজ। আজ আমরা আছি, একটা সময় আমরা থাকব না। কিন্তু একটি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শতাব্দীর পর শতাব্দী দেশকে সেবা দিতে পারে। আমাদের স্বপ্নরিহ্যাব ইউনিভার্সিটি অব বিল্ডিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আরইউবিটি) এমন একটি প্রতিষ্ঠান হবে, যেখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের জীবন গড়বে না, বাংলাদেশের উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক মর্যাদাবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলুক রিহ্যাব সদস্যরা শুধু ভবন নির্মাণ করেনি, তারা মানুষ গড়ার জন্যও একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ

ড. আলী আফজাল : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার মাধ্যমে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত