‘রক্ত দিন, রক্ত দিন’ করে হামে আক্রান্ত শিশু আয়াতুল কাইন আনারের (বয়স ১০ মাস) মা ফারজানার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঢাকার শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আদরের শিশুসন্তানকে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রেখে ফারজানা জরুরি বিভাগের সামনে ও সড়কে উ™£ান্তের মতো দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে উচ্চারণ করছেন, ‘রক্ত দিন, রক্ত দিন।’ শিশু আয়াতুল কাইন হাসপাতালের আইসিইউতে ১০ নম্বর বেডে শুয়ে বাঁচার লড়াই করছে। শিশুটির বাবা আরশাদ শাহরিয়ার রক্তের জন্য শহরের ব্লাড ব্যাংকগুলোতে ছোটাছুটি করছেন। দুপুর পৌনে ১টায় এক ব্যাগ রক্তের সংস্থান করে আয়াতুল কাইনের শরীরে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন শিশু হাসপাতালের আইসিইউর চিকিৎসকরা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা
শিশুসন্তানের ‘ও’ পজিটিভ গ্রুপের বেশ কয়েক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজনের কথা জানান আইসিইউর দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক। হামে আক্রান্ত শিশু আয়াতুল কাইন আনারের এখন দুটি কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত জানান মা ফারজানা।
তিনি জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আয়াতুল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। ব্লাডে ইনফেকশন, খাদ্যনালিতেও ইনফেকশন। সর্বশেষ গতকাল সোমবার চিকিৎসকরা জানান, শিশু কাইনের দুটি কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার খবর জানান ফারজানাকে। তাই নাড়িছেঁড়া ধনকে বাঁচিয়ে রাখতে মা ফারজানা এখন পাগলপ্রায়। পৃথিবীর কষ্ট এখন শিশু কাইনের মা ফারজানাকে গ্রাস করেছে। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভীষণ ক্ষোভও জমে আছে তার ভেতরে। আয়াতুল কাইনের শোকার্ত মায়ের মুখে চিকিৎসকদের সেবায় অবহেলার অভিযোগও আছে। মুমূর্ষু শিশু কাইনের মা দাবি করেন, তার হামে আক্রান্ত শিশুর দুটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে।
গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের হাম আক্রান্ত ওয়ার্ডে নবজাতক ও শিশুদের কান্না ও বাবা-মায়ের আহাজারি। সে সময় হাসপাতালের আইসিইউ থেকে চিৎকার করে কান্নায় দৌড়ে বের হন শিশু আয়াতুল কাইন আনারের মা ফারজানা। তার চাওয়া শুধু রক্ত!
ফারজানা জানান, তার শিশুসন্তান হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ১৭ মে, ২০২৬। কুড়িল বিশ্বরোডে, কুড়াতলি মহল্লায় বসবাসকারী কাইনের বাবা ও মা শিশুকে নিয়ে প্রথমে মহাখালী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসক কোরবানি ঈদের দিন আয়াতুল কাইন আনারকে রিলিজ দিয়ে দেন। চিকিৎসক জানান, শিশুটি হাম ভাইরাসমুক্ত।
শিশুটির মা ফারজানা দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রিলিজ নেওয়ার আগে আমরা হাসপাতালের চিকিৎসককে বলছিলাম আমার শিশুসন্তানের একটা এক্স-রে ও ব্লাড টেস্ট করে সুস্থতা নিশ্চিত করতে। চিকিৎসক শিশুর বাবা ও মা-কে জানান, ‘আয়াতুলের সবই ভালো আছে। বাবুর সব দিক ভালো আছে, বাবুর হার্টবিটও ভালো আছে। আমরা আনন্দের সঙ্গে ঈদের দিন বাসায় এসে পড়েছি।’
শিশু আয়াতুলের মা বলেন, ‘ঈদের দিন রাত গেছে ভালো, ঈদের পরদিন থেকে জ্বর শুরু হয়েছে। তা দেখে দেরি না করেই আমরা আবার ডিএনসিসি হাসপাতালে চলে যাই। যাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে চেষ্টা করি। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের জানাই, ‘আমার বাচ্চার তো জ্বর কমছে না; ১০৪, ১০৫, ১০৬ পর্যন্ত জ্বর উঠছে। জ্বর নামে না। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, ডিএনসিসি হাসপাতাল ভর্তি নেয়নি।
‘সেখান থেকে আমরা কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছুটে যাই। কিন্তু ভর্তি করাতে ব্যর্থ হই। তারপর উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাতে সক্ষম হই। আমার মুমূর্ষু শিশুকে সিটে নিয়ে চার দিন বসে থাকি।’ ফারজানা অভিযোগ করেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে সুচিকিৎসা পায়নি আয়াতুল কাইন। ভালো ট্রিটমেন্ট না পেয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একাধিকবার যাই। আমার বাচ্চার কোনোভাবেই জ্বর কমছিল না। ইমার্জেন্সির বড় বড় ডাক্তারদের সঙ্গে তেমন কথা বলা যায় না। ক্যাটক্যাট করে ওঠে। তবে একটা মেডিসিন লিখে দিল তা খাইয়েছি। পরের দিন সকালে শনিবারে ডাক্তার আমার সন্তানকে দেখতে এসে তারা জানিয়ে দিল বাচ্চার অবস্থা খারাপ। আমাদের রিলিজ দিয়ে জানাল অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা আমাদের। কেনোভাবেই কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল আমার সন্তানকে রাখবে না। কাইনের অবস্থা খারাপ হতেই থাকে। ইমার্জেন্সি আইসিইউ লাগবে, ভর্তি করতে হবে।’
ফারজানা দাবি করেন, ‘পরে আমার শ্বশুর অন্য একটা মাধ্যমে শিশু হাসপাতালে যোগাযোগ করে তার নাতিকে গত শনিবার ভর্তি করেছে। এখানেও কয়েক ঘণ্টা মুমূর্ষু শিশু কাইনকে নিয়ে অপেক্ষা করেছি। ওই রাতে আইসিইউ খালি হলে সেখানে ১০ নম্বর বেডে রেখে তার চিকিৎসা চলছে।’
আইসিইউর দায়িত্বরত চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাইনের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। নিউমোনিয়া ভয়াবহ। খাদ্যনালিতে ক্ষত ও দুটি কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত। তার দাবি, বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বাচ্চাদের ভর্তি করা হয়। সেখান থেকেই হামে আক্রান্ত বাচ্চারা মুমূর্ষু অবস্থায় এখানে এসে ভর্তি হয়।’