আরবি সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি আবুল আতাহিয়া। তিনি আব্বাসীয় খেলাফতের সময় আখেরাতমুখী, তওবা ও তাকওয়া কেন্দ্রিক কাব্য রচনা করে অনেক খ্যাতি লাভ করেন। তার কবিতার ছত্রে ছত্রে পরকালের চিন্তা এবং আল্লাহর ভয়ের কথা গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে সাময়িকভাবে আকর্ষণ করলেও জীবনের পরিণত বয়সে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ছাড়া মানুষের আর কোনো পাথেয় নেই। তার এই জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক চেতনা শুধু তৎকালীন সমাজের জন্যই নয়, বরং সর্বকালের মানুষের জন্য এক অমূল্য শিক্ষা হিসেবে সমাদৃত।
আবুল আতাহিয়া লিখেছেন, ‘ভয় ও শঙ্কার জগতে আমি নব্বই বছর অতিবাহিত করেছি। তাকওয়া ব্যতীত আর কোনো পাথেয় নেই। তা অর্জন করো, না হয় দূর হও।’
এই কবিতায় আবুল আতাহিয়া জীবনের নশ্বরতা ও ক্ষণস্থায়িত্বের কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ নব্বই বছরের জীবন পরিক্রমায় তিনি উপলব্ধি করেছেন, এই পৃথিবী একটি অস্থায়ী ও কম্পমান আবাসস্থল, যেখানে স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। মৃত্যুর পর পরকালীন জীবনের দীর্ঘযাত্রায় মানুষের একমাত্র সম্বল বা পাথেয় হলো তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। তাই তিনি নিজের আত্মাকে এবং মানবজাতিকে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে তাকওয়া অর্জনের জোর তাগিদ দিয়েছেন, কারণ তাকওয়াহীন জীবন ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না।
লোভ ও প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তাকওয়া অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও।’ (সুরা তাকাসুর ১-২)
মহান আল্লাহ এই আয়াতে মানুষের একটি স্বভাবজাত দুর্বলতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। মানুষ প্রতিনিয়ত ধন-সম্পদ, সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। এই লোভ ও মোহ তাদের এত গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, তারা পরকাল ও মৃত্যুর কথা একেবারে ভুলে যায় এবং একসময় এ অবস্থাতেই কবরে পৌঁছায়। এটি বস্তুবাদী জীবনের এক চরম পরিণতি, যা থেকে আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করেছেন, যেন তারা সময় থাকতে সত্যের পথে ফিরে আসে।
কবি আবুল আতাহিয়া লিখেছেন, ‘লোভী মানুষ কখনো প্রশান্তি পায় না। তার ওপর দুঃখ ও ক্লান্তি নেমে আসে। অন্যায়, লোভ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ এমন এক ফেতনা, যা থেকে আরব-অনারব কেউই রক্ষা পায় না। যে ব্যক্তি সন্তুষ্টির জীবন গ্রহণ করে, তার জীবনে কোনো কষ্ট নেই। আর যে অল্পে তুষ্ট নয়, তার জন্য পুরো পৃথিবী সোনা হয়ে গেলেও তা যথেষ্ট হবে না। সহজ জীবনে শান্তি নেমে আসে। লোভে শ্রম ও ক্লান্তি বাড়ে। প্রকৃত ধনী সেই ব্যক্তি, যার হৃদয়ে আল্লাহভীতি রয়েছে, সোনা বা রূপায় নয়।’
এখানে মূলত পার্থিব লোভের ক্ষতিকর দিক এবং অল্পে তুষ্ট থাকার প্রশান্তির কথা বলা হয়েছে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত ধনী সে নয় যার অনেক ধন-সম্পদ আছে, বরং প্রকৃত ধনী হলো সেই ব্যক্তি যে অল্পে তুষ্ট। মানুষের সম্মান ও মর্যাদা সোনা-রুপার ওপর নির্ভর করে না, বরং আল্লাহর প্রতি তার তাকওয়া বা ভীতির ওপর নির্ভর করে। লোভ মানুষকে শুধু ক্লান্ত করে আর ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। যে ব্যক্তি লোভের ফাঁদে পা দেয়, পুরো পৃথিবীর সম্পদও তার তৃষ্ণা মেটাতে পারে না।
কবি আবুল আতাহিয়া লিখেছেন, ‘আমার মহান রবই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি কতইনা উত্তম মালিক ও উত্তম সাহায্যকারী। আমার কি বা চাওয়ার থাকতে পারে, যদি আমার বাসস্থান, হালাল খাদ্য এবং লজ্জা ঢাকার মতো বস্ত্র থাকে। হাতপাতা লোকরা দরিদ্র নয়, বরং তারাই দরিদ্র, যারা স্বল্পে তুষ্ট হয় না।’ (দেওয়ান, আবুল আতাহিয়া)