মহান আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা ইমানদারদের সবচেয়ে চাওয়া। এটি হলো সুরক্ষিত দুর্গ, সুদৃঢ় স্তম্ভ, ঝড়ের মুখে অটল পাথর এবং প্রবল স্রোতের সামনে সুউচ্চ পর্বত। এর মাধ্যমে স্বভাব-প্রকৃতিকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা হয়, বিবেককে পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচানো হয় এবং অন্তরকে পরিবর্তন ও বিমুখতা থেকে সুরক্ষিত রাখা হয়। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি এই দোয়া পড়তেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।’ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার প্রতি এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি ইমান এনেছি, এরপরও কি আপনি আমাদের বিষয়ে ভয় পান? তিনি বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই অন্তরগুলো আল্লাহর আঙুলগুলোর মধ্যে দুটি আঙুলের মাঝে অবস্থিত, তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন। (সুনানে তিরমিজি ২১৪০)
মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, অবিচলতা এমন এক নেয়ামত যা দুনিয়া ও আখেরাতে ইমানদারদের প্রদান করা হয়। তিনি বলেছেন, ‘যারা ইমান এনেছে আল্লাহ তাদের দুনিয়ার জীবনে ও আখেরাতে সুদৃঢ় বাক্য দ্বারা অবিচল রাখেন এবং আল্লাহ জালেমদের পথভ্রষ্ট করেন। আর আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।’ (সুরা ইবরাহিম ২৭)
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, তারপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না এবং দুঃখ করো না, আর সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।’ (সুরা ফুসসিলাত ৩০)
হে মুসলিম সমাজ! যে ব্যক্তি দ্বীনের ওপর অবিচল থাকবে, সে আল্লাহর ইচ্ছায় তার লক্ষ্য অর্জন করবে এবং তার আকাক্সক্ষা পূরণ করবে। মহান আল্লাহ তাকে হেদায়াতের ওপর অবিচল রাখবেন এবং বিচ্যুতি ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করবেন। এর সবচেয়ে বড় উপায় হলো একত্ববাদ বাস্তবায়ন করা, আল্লাহকে শক্তভাবে ধারণ করা এবং তার কাছে সাহায্য চাওয়া। এরপর আল্লাহর কিতাব ও নবীজির সুন্নতকে জানা, বোঝা এবং আমলের মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে এই মহান মূলনীতির বিষয়ে ওসিয়ত করে বলেছেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো মহান আল্লাহর কিতাব ও তার নবীর সুন্নত। (মুয়াত্তা মালিক)
যে ব্যক্তি এই দুটিকে শক্তভাবে ধারণ করবে, তার বুঝ কখনো বিভ্রান্ত হবে না, সন্দেহ তাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না এবং প্রবৃত্তির তাড়না তাকে ফেতনায় ফেলতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘বলুন, রুহুল কুদুস (জিবরাইল) এটি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবতীর্ণ করেছেন, যারা ইমান এনেছে তাদের অবিচল রাখার জন্য এবং মুসলিমদের জন্য হেদাযয়েত ও সুসংবাদস্বরূপ।’ (সুরা নাহল ১০২)
মহান আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার অন্যতম ভিত্তি হলো সালফে সালেহিনদের (পূর্বসূরি নেক লোক) পথ ও তাদের বুঝকে আঁকড়ে ধরা। ইরবাদ ইবনে সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সুন্নত এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নতকে আঁকড়ে ধরো। (সুনান আবু দাউদ ৪৬০৭)
সুতরাং তাদের পথ অনুসরণ করুন, তাদের নীতি অবলম্বন করুন, তাদের উত্তরসূরি আলেমদের থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করুন এবং তাদের দিকেই ফিরে যান, বিশেষ করে যখন কোনো বিপদ আসে এবং সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কারণ আলেমরা হলেন হেদাযয়েতের নিদর্শন এবং অন্ধকারের প্রদীপ। দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার অন্যতম প্রধান উপায় হলো মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা। যেমন কোরআনে ইমানদারদের দোয়া সম্পর্কে এসেছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করবেন না এবং আপনার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা।’ (সুরা আলে ইমরান ৮)
অবিচল থাকতে যা সাহায্য করে তার মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত মহান আল্লাহর জিকির করা। কারণ এটি হলো সংযুক্ত রশি এবং কাক্সিক্ষত পাথেয়। মহান আল্লাহ সবচেয়ে কঠিন, জটিল, অন্ধকারময় ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও অবিচলতার সঙ্গে জিকিরকে যুক্ত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হও, তখন অবিচল থাকো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আনফাল ৪৫) আর আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার অন্যতম আরেক উপায় হলো সৎসঙ্গ অবলম্বন করা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। (সুনানে তিরমিজি ২৩৭৮)
অবিচল থাকার আরেকটি উপায় হলো পাপাচার ও মন্দ কাজ ত্যাগ করা এবং গুনাহ ও অপরাধ থেকে দূরে থাকা। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ এগুলো মানুষের ওপর জমতে থাকে, শেষ পর্যন্ত তাকে ধ্বংস করে দেয়। (মুসনাদ আহমদ ৩৮১৮) সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা! অবিচল থাকুন। এক আনুগত্যের পর আরেক আনুগত্য কতই না সুন্দর এবং এক সৎকাজের পর আরেক সৎকাজ কতই না চমৎকার! আর সেই ব্যক্তির জন্য আক্ষেপ, যে তার দৃঢ়ভাবে বোনা জিনিস খুলে ফেলে এবং যা সে নির্মাণ করেছিল তা ভেঙে ফেলে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে।’ (সুরা নাহল ৯২)
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, মুমিনের আমলের জন্য মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়নি। এরপর তিনি মহান আল্লাহর বাণী তেলাওয়াত করেন, ‘তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো।’ (সুরা হিজর ৯৯)
হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যেমনটি আপনাদের রব নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।
হে আল্লাহ! আপনি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর শান্তি বর্ষণ করুন, যেমন আপনি বিশ্বজগতে ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের ওপর শান্তি বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মর্যাদাবান। আর আপনি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর বরকত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি বিশ্বজগতে ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের ওপর বরকত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মর্যাদাবান। আপনি হেদাযয়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীন, সব সাহাবি, তাবয়ি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করবে তাদের ওপর সন্তুষ্ট হোন। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু! আপনার দয়া, অনুগ্রহ ও বদান্যতায় তাদের সঙ্গে আমাদের ওপরও সন্তুষ্ট হোন।
হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মানিত করুন, দ্বীনের সীমানাকে সুরক্ষিত রাখুন এবং এই দেশকে ও মুসলিমদের অন্যান্য দেশকে নিরাপদ, শান্ত ও সমৃদ্ধ করুন। হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! হে আল্লাহ! হাজিদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, তাদের প্রচেষ্টাকে প্রশংসনীয় করুন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! তাদের যাত্রাকে শুভ করুন, তাদের প্রত্যাবর্তনকে প্রশংসনীয় করুন এবং তাদের পথকে নিরাপত্তা ও শান্তির পথ বানিয়ে দিন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নিরাপত্তাকর্মী ও সীমান্তরক্ষী সেনাদের সাহায্য করুন, আপনার সুরক্ষায় তাদের হেফাজত করুন, আপনার তত্ত্বাবধানে তাদের রাখুন, আপনার আশ্রয়ে তাদের সুরক্ষিত করুন। হে আল্লাহ! দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা দূর করে দিন, বিপদগ্রস্তদের বিপদ দূর করে দিন, ঋণগ্রস্তদের ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিন, রোগীদের সুস্থতা দান করুন এবং মৃতদের প্রতি রহম করুন।
হে আল্লাহ! ফিলিস্তিনে এবং সব জায়গার দুর্বল মুসলিমদের সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! মসজিদুল আকসাকে রক্ষা করুন এবং কেয়ামত পর্যন্ত একে সমুন্নত ও সম্মানিত রাখুন। হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা নাহল ৯০)
আপানারা মহান আল্লাহকে স্মরণ করুন। তিনি আপনাদের স্মরণ করবেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড়। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫)
৫ জুন শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান