এবার কার ঘরে যাচ্ছে বিশ্বকাপ

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০২:৫৩ এএম

বাংলাদেশ থেকে অগণিত সাধারণ ফুটবল রসিক সব সময় চান যার যার প্রিয় দল ব্রাজিল নতুবা আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হোক। দেশের অধিকাংশ মানুষের ফুটবল মনন তো এই দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই এই দুই দল। বাকি ৪৬টি দলের বিষয়ে আগ্রহ কম। এশিয়া মহাদেশ থেকে এবার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রতিনিধিত্ব করছে (কাতার, ইরান, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জর্ডান, ইরাক, উজবেকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়া) ৯টি দেশ। এদের নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। ধরে নেওয়া হচ্ছে তারা তো খুব একটা এগোতে পারবে না। অদ্ভুত এক ধরনের ভালোবাসা ও আবেগ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকরা প্রিয় দলের জন্য ইতিমধ্যেই সমাবেশ এবং আনন্দ মিছিল করেছেন। কয়েক জায়গা থেকে আবার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দুঃখের বিষয় হলো ফুটবল তো আমার, আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী চলে না। আনন্দ ও বেদনার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ মহোৎসব এগিয়ে চলবে! ৪ বছর পর পর আমাদের দেশের মানুষ যেভাবে এই খেলাটি নিয়ে মেতে ওঠেন, তার কোনো তুলনা নেই। ৪ বছর পর পর অনির্ধারিত সবার জন্য উৎসব ১৮ কোটি মানুষের দেশে।

ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে, ঘরে-বাইরে দুই দেশের পতাকা উড়ছে। প্রিয় দলের জার্সি পরে দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। এখন শুরুর প্রতীক্ষায় কয়েকটি প্রহর গোনা। এর পরই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল উৎসব। সেই উৎসবে শরিক হবে পরিবার, সমাজ এমনকি পুরো দেশ। পাল্টে যাবে জীবনপ্রবাহ।

এখন চিন্তায় যেটি বেশি কাজ করছে, সেটি হলো বিশ্বকাপ এবার কার ঘরে যাচ্ছে? ল্যাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারবে, না এটি আবার চলে যাবে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর কবজায়?

এবারই প্রথম তিনটি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র কানাডা ও মেক্সিকো) সম্পৃক্ত করে বিশ্বকাপ আয়োজন। সোজাসুজি বলা যায় এই তিন স্বাগতিক দেশের কোনো সম্ভাবনা নেই বিশ্বকাপ জয়ের। ফুটবলের একটি চোখ সব সময় আছে পেছনের দিকে। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র সাতটি স্বাগতিক দেশ শিরোপা বিজয়ের গৌরবে গৌরান্বিত হয়েছে।

আসন্ন বিশ্বকাপে এশিয়ার কোনো দেশের সম্ভাবনা নেই এটি রূঢ় বাস্তবতা। অতীতে এশিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়া একবার সেমিফাইনালে (২০০২) এবং উত্তর কোরিয়া একবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। বিশ্বকাপের ফুটবল মঞ্চে আফ্রিকান দেশগুলোর পারফরম্যান্স মোটেই ভালো নয়। এ পর্যন্ত ১৩টি আফ্রিকান দেশ যৌথভাবে ৪৯টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে কাতার বিশ্বকাপে একমাত্র মরক্কো সেমিফাইনালে খেলেছে। আফ্রিকা মহাদেশের খেলোয়াড়রা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘরোয়া ফুটবল খেলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আফ্রিকান খেলোয়াড় আবার নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বিভিন্ন দেশের হয়ে জাতীয় দলে খেলেন। মধ্য আমেরিকান দেশগুলো মাত্র চারবার এবং নর্থ আমেরিকান এবং ক্যারাবিয়ান দেশ খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে ৫ বার। এদিকে ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলোর যৌথভাবে এ পর্যন্ত ৩৬টি কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে। সেখানে ইউরোপের দলগুলো খেলেছে ১০৫টি কোয়ার্টার ফাইনাল। বিশ্বকাপে ইউরোপ অনেক বেশি এগিয়ে।

বিশ্বকাপে অঘটন ঘটবে না, অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখা যাবে না এটি তো হতে পারে না। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলতে নেমে পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন দল প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছে। ১৯৫০ ও ২০১৮ সালে ইতালি। ব্রাজিল ১৯৬৬ সালে। ফ্রান্স ২০০২ সালে। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে জার্মানি। পচা শামুকে সবচেয়ে বেশি পা কাটে ফুটবলে। ফুটবল রসিকতা করতে সব সময় পছন্দ করে। পছন্দ করে মানুষের হƒৎপিণ্ড নিয়ে ইচ্ছেমতো খেলতে। এর মধ্যে আছে তার এক ধরনের অতৃপ্তি।

বিশ্বকাপ ফুটবল ‘ডমিনেট’ করছে ইউরোপের দলগুলো। এর অন্যতম কারণ হলো তাদের সুসংগঠিত ঘরোয়া লীগ ও অন্য টুর্নামেন্ট। ১৫টি ইউরোপিয়ান দল যৌথভাবে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন রানার্সআপ এবং তৃতীয় স্থান দখল করেছে এ পর্যন্ত ৪৭ বার। এর মধ্যে জার্মানির পারফরম্যান্স সবচেয়ে ভালে তারা চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে চারবার করে। জার্মানি ফুটবলে এমন একটি শক্তি যারা মাঠে লড়াই ছাড়া আর কিছু বুঝে না।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। এটি ধরে রাখার সম্ভাবনা খুব কম। বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স। পর পর দুটি বিশ্বকাপে তারা রানার্সআপ হয়েছে। ফ্রান্সের লক্ষ্য এবার ট্রফি জয়। আর এটি হবে ফ্রান্সের দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা বিজয় । বিশ্বের ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ জিতবে ফ্রান্স। তবে তারা অকপটে স্বীকার করেছেন মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না কঠিন, তার চেয়েও ঢের কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা। অন্যদিকে স্পেনও একবার শিরোপা জিতেছে। স্পেনের ২৬ জন খেলোয়াড়ি স্কোয়ার্ড ভারসাম্যপূর্ণ। তারা আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি শৈল্পিক ফুটবল খেলছে।

এবারের স্কোয়ার্ড ২০২২-এর বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। কিছুটা অবাক হচ্ছি ইংল্যান্ড এবং জার্মানি নিয়ে এবার তেমন আলোচনা নেই। ইংল্যান্ড তো মাত্র একবার (১৯৬৬) বিশ্বকাপ জয় করেছে। গত আসরে ভালো দল নিয়েও শেষ পর্যন্ত আর সামাল দিতে পারেনি। ৭০ বছর ধরে ট্রফি জয়ের জন্য লড়াই করে চলেছে শক্তিশালী দল। তবে দারুণ শক্তিশালী বলা যাবে না। জার্মানি চাইছে প্রথম থেকে জয় দিয়ে শুরু করতে। জানি না তারা পারবে কি না এবার ব্রাজিলের পাঁচবারের সমান হতে। ব্রাজিল গত ২৪ বছর ধরে ট্রফি ছুঁতে পারেনি। দুনিয়াজুড়ে সমর্থকরা হতাশ। এবারই প্রথম ব্রাজিল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বিদেশি কোচ (ইতালিয়ান) নিয়োগ দিয়েছে তার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে চাইছে। আসন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮ দলের মধ্যে ২৬ দলের কোচ বিদেশি। আর এই ক্ষেত্রে আর্জেন্টাইন কোচের সংখ্যাই বেশি। অন্য যেকোনো বারের তুলনায় পর্তুগাল নিয়ে অনেক বেশি এবার আলোচনা হচ্ছে। রোনালদোর এটি শেষ বিশ্বকাপ। তিনি তার সতীর্থদের নিয়ে সেরাটা উজাড় করে দিতে চাইবেন দেশকে এমনকি উপহার দিতে, যা সব সময় মনে থাকবে। বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ টুর্নামেন্টের জন্য প্রয়োজন ইনজুরি ফ্রি কমপ্লেক্স দলের। এবং খেলার রঙ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সঠিকভাবে মানিয়ে নেওয়া।

বিশ্বকাপ এখন কোচদের জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে একে অন্যের হাঁড়ির খবর সহজেই জানতে পারছে। এর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে নতুন ছক, স্টাইল এবং দলীয় ক্রীড়া শৈলী। বিশ্বকাপ ঘিরে এখন অনেক জল্পনা-কল্পনা। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর জল্পনা-কল্পনা আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই স্বাভাবিক। পাশ্চাত্যের ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা আমাদের কোনো সঠিক ধারণা দিতে পারছেন না। সবকিছু অনুমানভিত্তিক। দেশে লক্ষ্য করেছি গ্রুপ পর্যায়ে দলগুলোকে নিয়ে যে পর্যালোচনা প্রিন্ট মিডিয়াতে উঠে এসেছে এগুলো একই জায়গা থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে হুবহু অনুবাদ। বিশ্বকাপকে সব সময় আলাদা গুরুত্ব দেয় মিডিয়া। মিডিয়াতে মৌলিক রাইটাপের সংখ্যা কমছে। ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ, এতে করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। ফুটবল আট দেশের বাইরে যাচ্ছে না এটি জোর দিয়েই বলেছেন একজন অতি পরিচিত ব্রিটিশ ফুটবল রাইটার মাইক মিডিলটন। তার কথা হলো খেলা শুরু হলে আবার অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা হয়। এর জন্য অপেক্ষা করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ফুটবলকে চেনা মুশকিল। মাঠের ফুটবল ক্রমেই রূপ পাল্টায়।

বিশ্বকাপে সব দলই সমানভাবে শক্তিশালী তা কিন্তু নয়, এটি ফিফাও দাবি করে না। কোয়ালিফাইংয়ের লড়াইয়ে ভালো দল হরহামেশাই বাদ পড়েছে। আবার অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল উঠে এসেছে। এর সমাধান ফিফার কাছে আছে কি না জানি না। বিশ্বায়ন এবং বাণিজ্য ফুটবলকে অনেক বড় করছে। পাশাপাশি আবার কিছু সমস্যারও সৃষ্টি করছে। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মঞ্চে আপনি অনিশ্চয়তা আর অঘটন থেকে মুক্ত হতে পারবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত এই বর্ণিল আসরে সমাপ্তি শেষ হুইসেলটা না বাজে। জয়তু খেলার রাজা ফুটবল। সবাই মিলেমিশে গণতান্ত্রিক এই খেলাটি উপভোগ করি। জীবনে আনন্দ খোঁজার বিকল্প নেই।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত