বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন আর স্মৃতির এক মিলনমেলা। চার বছর পরপর যখন বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে, তখন ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অন্যরকম এক উত্তেজনা কাজ করে। প্রজন্ম বদলায়, খেলোয়াড় বদলায়, খেলার ধরন বদলায়, কিন্তু বিশ্বকাপের আবেদন কখনো ফুরায় না।
এবারের বিশ্বকাপ হবে আরও বড় পরিসরে। ৪৮টি দল অংশ নেবে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়। এত বেশি দল অংশ নেওয়ার কারণে অনেক নতুন দেশকে আমরা বিশ্বমঞ্চে দেখব। এমনও কিছু দেশ আছে, যাদের ফুটবল নিয়ে আগে খুব একটা আলোচনা হতো না। কিন্তু তারা কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। এটিই বিশ্বকাপের সৌন্দর্য। বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক দেশের প্রতিযোগিতা শেষে সেরা দলগুলোই সেখানে খেলার সুযোগ পায়। যারা জায়গা করে নিয়েছে, তাদের জন্য এটি গর্বের বিষয়। আর আমরা দর্শকরা দূর থেকে সেই উৎসব উপভোগ করব।
বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতাও সময়ের সঙ্গে অনেক বদলে গেছে। এখন প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ম্যাচ মুহূর্তেই দেখা যায়। কিন্তু আমাদের সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সব খেলা দেখার সুযোগ ছিল না। সীমিত সংখ্যক ম্যাচ সম্প্রচার হতো। তবুও সেই অপেক্ষা, সেই আগ্রহ ছিল অসাধারণ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী নৈপুণ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। বিশ্বকাপ এমনই একটি মঞ্চ, যেখানে কিংবদন্তিরা জন্ম নেন এবং ইতিহাস রচনা করেন।
আমি ১৯৬২ সাল থেকে বিশ্বকাপ ও আন্তর্জাতিক ফুটবল অনুসরণ করছি। সেই সময় পেলের খেলা দেখে ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে যাই। পেলের ব্রাজিল ছিল শিল্পের মতো ফুটবল খেলার প্রতীক। পরবর্তী সময়ে গারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো, একেকজন ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাই ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা আজও রয়ে গেছে। তবে বাস্তবতা হলো, ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের দলে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু আগের মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের প্রাচুর্য চোখে পড়ে না। দল হিসেবে তারা এখনো শক্তিশালী, কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যে ভারসাম্য ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, সেখানে কিছু ঘাটতি দেখা যায়। তবুও ব্রাজিলকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে।
অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বেশ ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল। তাদের খেলায় পরিকল্পনা আছে, শৃঙ্খলা আছে এবং বিভিন্ন বিভাগে সমন্বয়ও ভালো। বিশ্বকাপে সাফল্যের জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন, তার বেশিরভাগই তাদের মধ্যে বিদ্যমান। সে কারণে আগামী বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছি।
একসময় দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের ফুটবলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। এখন সেই ব্যবধান অনেকটাই কমে গেছে। ইউরোপীয় দলগুলো কৌশলগতভাবে আরও পরিণত হয়েছে। স্পেনের মতো দল বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আবার দক্ষিণ আমেরিকার অনেক তারকা খেলোয়াড় এখন ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে খেলে। ফলে দুই অঞ্চলের ফুটবল দর্শনও অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অনিশ্চয়তা। এখানে শুধু পরিসংখ্যান বা শক্তির হিসাব কাজ করে না, কাজ করে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও মুহূর্তকে নিজেদের করে নেওয়ার ক্ষমতা। আর সে কারণেই বিশ্বকাপ ফুটবল আজও বিশে^র সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ক্রীড়া আয়োজন। কোটি মানুষের মতো আমিও সেই মহোৎসবের অপেক্ষায় আছি।
লেখক : সাবেক তারকা ফুটবলার ও কোচ