ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে দেশের আর্থিক খাত চাপে থাকলেও পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আশা দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতের চাপা পড়ে থাকা দুর্বলতাগুলো এখন প্রকাশ্যে আসায় ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পুনঃঅর্থায়ন, প্রণোদনা এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পেতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজার, বীমা ও ক্ষুদ্রঋণ খাতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে এর একটি বড় কারণ হলো, আগে বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে প্রকৃত ঝুঁকি আড়ালে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকগুলো অনেক বেশি সতর্ক ও রক্ষণশীলভাবে ঋণ শ্রেণিকরণ করায় প্রকৃত অবস্থাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ বাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের পরও বেশির ভাগ সূচকের অবনতি হয়েছে। বছর শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।
আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ বেড়েছে। আয়-সৃষ্টিকারী সম্পদ কমে যাওয়ার বিপরীতে বেশি প্রভিশন হওয়ায় অনেক ব্যাংকে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মূলধনের ওপর। ফলে শিল্পের গড় মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেতিবাচক দেখাচ্ছে। তবে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের কারণে পুরো খাতের চিত্র এমন হয়েছে; এখনো অনেক শক্তিশালী ব্যাংক রয়েছে, যেগুলো বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা পূরণে সক্ষম।
তিনি বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউলিংকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি সংকটে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সাময়িক সুযোগ। অনেক ব্যবসায়ীকে খেলাপিমুক্ত করে তাদের ব্যবসা পুনর্গঠনের সময় দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু খেলাপিমুক্ত করলেই হবে না; তাদের নতুন করে কার্যকরী মূলধন ও অর্থায়নের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, সঠিক তদারকি এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত হবে।
অন্যদিকে বৈদেশিক খাত থেকে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। রপ্তানি আয় প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবাসী আয়েও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।
আরিফ হোসেন খান জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ বা সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত অনেক শিল্প-কারখানাকে পুনরায় সচল করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো, ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সংস্কার কার্যক্রম, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াবে। আর ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী হলে পুরো আর্থিক খাত এবং অর্থনীতিও পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, দুর্দশাগ্রস্ত এসব ঋণের বড় অংশই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সৃষ্ট। তবে ওই সময় এসব ঋণ কৌশলে নিয়মিত দেখানো হতো। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করে।
ব্যাংক খাতে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শ্রেণিকৃত (ক্লাসিফায়েড) ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে ডাউন পেমেন্টের বিধান চালু করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাধারণত ১০ শতাংশের নিচে ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিলের সুযোগ খুবই সীমিত। এরপরও দেশের অনেক ব্যবসায়ী কেন নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, তা বোধগম্য নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাস্তব ও অনিবার্য সংকটের কারণে সমস্যার মুখে পড়েছে; তাদের পরিস্থিতি অবশ্যই আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।