জোড়া গোল করে রোনালদোর ঘোষণা 'আই অ্যাম ব্যাক'

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০১:২৮ এএম

‎বিশ্বকাপের শুরুতেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি করেছেন হ্যাটট্রিক। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আর্লিং হালান্ডদের মতো তরুণ তুর্কিরা গোল উৎসবে মেতেছেন জোড়া গোলে। ঠিক তখনই ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে মাঠের ছায়া হয়ে ছিলেন ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

দল ড্র করে পয়েন্ট হারিয়েছে, আর ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র সমালোচনা। ফুটবলবোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক— অনেকেই তার শেষ দেখে ফেলেছিলেন। তবে রোনালদো যে দমে যাওয়ার পাত্র নন, তা আবারও প্রমাণ করলেন বিশ্বমঞ্চে।

‎​২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে সব সমালোচনার মুখে যেন ছাই ঢেলে দিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে টিভির ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সটান চিৎকার করে রোনালদো ঘোষণা করলেন— "আই অ্যাম ব্যাক, আই অ্যাম ব্যাক" (আমি ফিরে এসেছি)!

‎কঙ্গো ম্যাচের পর পর্তুগিজ ফুটবল বোদ্ধাদের একাংশ রোনালদোকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু কোচ রবার্তো মার্টিনেজ আস্থা রাখেন তার অধিনায়কের ওপর। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ৩ মিনিট, তখনই নুনো মেন্ডেসের ক্রস থেকে খুব কাছ থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন রোনালদো। হতাশায় পিচ চাপড়াতে দেখা যায় তাকে।

‎তবে সেই আক্ষেপ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩ মিনিট। ম্যাচের ৬ মিনিটে জোয়াও ক্যানসেলোর নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হাফ-ভলিতে বল জালে জড়ান তিনি। এই এক গোলেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান রোনালদো— পৃথিবীর একমাত্র পুরুষ ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০৬ থেকে ২০২৬) গোল করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েন তিনি। মেসি ৬টি বিশ্বকাপ খেললেও ২০১০ আসরে গোল পাননি।

এরপর ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে বক্সের ভেতর বরফশীতল মাথায় নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোলটি করেন রোনালদো। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের ১০ম গোল পূর্ণ করে কিংবদন্তি ইউসেবিওকে (৯ গোল) টপকে বিশ্বকাপে পর্তুগালের এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান তিনি। পর্তুগালের হয়ে ১৪৫ গোল নিয়ে তার ক্যারিয়া গোল সংখ্যা দাড়ালো ৯৭৫।

 

‎ম্যাচ পর্তুগাল ৫-০ ব্যবধানে জিতলেও, দ্বিতীয়ার্ধের গল্পটা ছিল রোনালদোর হ্যাটট্রিক খোঁজার এবং উজবেক গোলরক্ষক আবদুভাহিদ নেমাতোভের দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর। ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটে রোনালদো অন্তত ৩টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন: প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে হ্যাটট্রিকের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন রোনালদো। তবে উজবেক ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করলে হ্যাটট্রিক বঞ্চিত হন সিআরসেভেন।

‎ম্যাচের ৭৩ মিনিটে নেলসন সেমেদোর পাস থেকে বক্সের ভেতর দুর্দান্ত মুভমেন্টে জায়গা বানিয়ে বাঁ-পায়ে শট নেন রোনালদো, যা ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করলেও উজবেক কিপার নেমাতোভ দারুণভাবে রুখে দেন। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই আলগা বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রোনালদোর করা হাফ-ভলিটি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন নেমাতোভ।

৭৪ মিনিটে বক্সের ভেতর শট নেওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা পেলেও রোনালদোর নেওয়া বাঁকানো শটটি ফার-পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।

‎ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে (৯০+৫ মিনিটে) ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে বল পেয়েও ঠিকঠাক সংযোগ করতে পারেননি রোনালদো, তার শটটি পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। অবশ্য পরে রেফারি অফসাইডের পতাকা তোলায় সেই মিসের লজ্জা থেকে কিছুটা বেঁচে যান তিনি।

‎রোনালদোর জোড়া গোলের পাশাপাশি ১৭ মিনিটে নুনো মেন্ডেসের অসাধারণ ফ্রি-কিক, ৬০ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের কর্নার থেকে খুসানভের আত্মঘাতী গোল এবং ৮৮ মিনিটে বদলি নামা রাফায়েল লিয়াওয়ের বুলেট গতির ফিনিশিংয়ে ৫-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে পর্তুগাল।

‎প্রথম ম্যাচে ড্রয়ের পর এই বিধ্বংসী জয়ে গ্রুপ 'কে'-এর শীর্ষে উঠে নক-আউটের পথ সহজ করল পর্তুগিজরা। হ্যাটট্রিক না পাওয়ার কিছুটা আক্ষেপ হয়তো রোনালদোর থাকবে, তবে তীব্র সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে ৪১ বছর বয়সেও যেভাবে তিনি ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলেন, তা ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল— সিংহের গর্জন সাময়িক থামলেও শিকার করা সে ভুলে যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত