জাতীয় সংসদ ২৯ জুন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীসহ অর্থ বিল-২০২৬ পাস করেছে। গত ১১ জুন সংসদে দেশের ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করা হয়, যা ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরের জন্য ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা (প্রায় ৭৬.৩ বিলিয়ন ডলার)। এটি বিএনপির নির্বাচিত সরকারের বিশ বছরে প্রথম বাজেট। আজ ৩০ জুন মঙ্গলবার সংসদে চূড়ান্ত কণ্ঠভোটে এ বাজেট পাস হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী মূলত প্রস্তাবিত ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং পরে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বল্প-আয়ের ব্যক্তি করদাতাদের নতুন করে করমুক্ত আয়সীমা ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা দিয়েছেন।
বহুল আলোচিত আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দাখিলের জমার শর্ত থেকেও সরে এসেছে সরকার।
অন্যান্য সাম্প্রতিক পরিবর্তন ভোক্তা ও ডিজিটাল ব্যবসার পক্ষে। সোনা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে জমির মালিক কর্তৃক ডেভেলপারের কাছ থেকে অ্যাপার্টমেন্টসহ প্রাপ্ত সুবিধার উপর ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স বহাল রয়েছে। তবে এই কর তিন বছরে পরিশোধ করা যাবে।
ব্যক্তি কর্তৃক অর্জিত লভ্যাংশের ফিক্সড কর হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ। আগে এই লভ্যাংশকে মোট আয়ের সঙ্গে যোগ করে নিয়মিত হারে কর আরোপ করা হতো, যার পরিমাণ হতো সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। লভ্যাংশের উপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করায় ব্যক্তির করভার লাঘব হবে এবং শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থবিলে কোম্পানি কর্তৃক অর্জিত লভ্যাংশের উপর ২০ শতাংশ হারে প্রচলিত করহার বিলোপ হয়েছিল, তার ফলে করহার সর্বোচ্চ ২৭.৫ শতাংশ হয়ে যেত। এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে করহার ২০ শতাংশ পুনর্বহাল রাখা হয়েছে।
পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির করহারের সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে আইপিও ও সরাসরি তালিকাভুক্তির শর্তের সঙ্গে আরপিওকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে যারা ১০ শতাংশের কম হারে শেয়ার অফলোড করে হ্রাসকৃত করের সুবিধা নিতে পারেনি, তারা আরপিওর মাধ্যমে ওই শর্ত পূরণ করে হ্রাসকৃত হারের করসুবিধা নিতে পারবেন।
সব ধরনের লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সম্পন্ন করার জন্য ২.৫ শতাংশ কর হার হ্রাস করার যে সুযোগ নির্দিষ্ট পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য ছিল, তা অন্যান্য কোম্পানির জন্যও প্রযোজ্য হবে। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই নিয়ম থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। শিল্পঋণ থেকে যানবাহন নিবন্ধন পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান তালিকার লেনদেনে ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) এখন বাধ্যতামূলক।
তবে বাজেটের কাঠামোগত মূল অংশ মূলত যেমন প্রস্তাবিত ছিল তেমনই রয়ে গেছে। মোট রাজস্বের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, জিডিপির ৩.৬ শতাংশ।
এর মধ্যে দেশীয় ব্যাংক ঋণ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায়, এবং সরকার বলেছে এই সীমা নির্দিষ্টভাবে বেসরকারি ব্যবসার জন্য ঋণের জায়গা রক্ষা করতে নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ৭.৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯.৪ শতাংশ ধরে নিয়েছে।
পুরো রাজস্ব লক্ষ্য পূরণে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমপক্ষে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার। এ হার বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত পৌঁছায়নি। দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ২০১১ সালে, ২৭ শতাংশের কিছু বেশি।
সিপিডির বিশ্লেষণ বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই–এপ্রিল সময়ে রাজস্ব ছিল মাত্র প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যেখানে বার্ষিক ভিত্তি ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ৯.৪ শতাংশ ধরে নেওয়া বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ ছিল। জুলাই–মে সময়ে মুভিং-গড় মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ, লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশের বিপরীতে।
এই বাজেট চক্রের একটি লক্ষণীয় দিক হলো ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। বাজেটে ব্যাংক পুনর্গঠনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬,৭০৬ কোটি টাকা, এ বছর দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্মূলধনীকরণে ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকার উপরে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮ক ধারা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে।
আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারায় একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরত আসার সুযোগ রাখা হয়েছিল। সংসদে বিরোধী দলগুলো বলেছিল, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী গতকাল বলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের বার্তা স্পষ্ট, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গড়ে তোলা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য বরাদ্দ প্রথমবারের মতো জিডিপির ১ শতাংশ অতিক্রম করেছে, এবং শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ১.৪১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১.৭৯ শতাংশ হয়েছে, উভয়ই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, তবু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে।
পরিবার কার্ড কর্মসূচি, যা প্রায় ৪১ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা দেয়, সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের ভিত্তি, যা বেড়ে জিডিপির ২.১১ শতাংশ হয়েছে। কৃষি ও নিত্যপণ্যের ওপর করের চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন এবং শিশুখাদ্য শিল্পেও নতুন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স সংস্কারমুখী দিকগুলো স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছে যে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭.৯৩ শতাংশে নেমে দশ বছরের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে।
সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারিতে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত পনেরো বছরের সর্বনিম্ন। জামায়াত প্রস্তাবিত বাজেটকে "জনবিরোধী ও লুটের বাজেট" আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে, এনসিপি এটিকে "উচ্চাভিলাষী কিন্তু রাজস্বগতভাবে অবাস্তব" বলেছে।
সরকার বাজেট পাশ হওয়ার আগে জনগণ ও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রকৃত ছাড় দিয়েছে, করমুক্ত আয়সীমা, টিআইএন বাধ্যবাধকতা ছাড় এবং অন্যান্য ছাড়ে। আবার রাজস্ব প্রবৃদ্ধি, ঋণ সম্প্রসারণ ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মূল অনুমানগুলো বাজেটের ঠিক আগের মাসগুলোতে নিজস্ব পরিসংখ্যান সংস্থা ও স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের প্রস্তাব থেকে ভিন্ন। প্রকাশ ও বাস্তবায়নের মধ্যে এই ব্যবধান কমবে কিনা তা স্পষ্ট হবে আগামী মাসগুলোতে ।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
LinkedIn - www.linkedin.com/in/jarin-binta-yeasin-b61b88278
Email – [email protected]