রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং প্রবল বাতাসের কারণে ফ্রান্সে পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে, একই সঙ্গে তীব্র গরমের প্রভাবে জনস্বাস্থ্যও চাপে পড়েছে। সরকারি প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ সপ্তাহে তাপপ্রবাহের সময় দেশটিতে অতিরিক্ত ২ হাজার ২৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
ফরাসি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে এই অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে। তবে বিস্তারিত বিশ্লেষণ শেষ হলে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হতে পারে।
অন্যদিকে, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে ৭ হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮ হাজার ৭০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে। সাধারণত জুলাইয়ের শেষ দিকে দাবানল তীব্র আকার ধারণ করলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বসন্তের পর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিশালী বাতাস যুক্ত হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চল। আউদ, পিরেনে-ওরিয়ঁতাল, বুশ-দ্যু-রোনসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় এখনো বড় আকারের দাবানল সক্রিয় রয়েছে। শুধু আউদ এলাকাতেই প্রায় ৯০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় আগুন দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় ২ হাজার দমকলকর্মী মাঠে কাজ করছেন। তাদের সহায়তায় ব্যবহার করা হচ্ছে অগ্নিনির্বাপক বিমান, কানাডেয়ার উড়োজাহাজ এবং হেলিকপ্টার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে হাজারো বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি অঞ্চলে আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল, গুদামঘর ও পর্যটন ক্যাম্পসাইট আগুনের হুমকির মুখে রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু এলাকায় সড়ক ও বিমান চলাচলেও সাময়িক সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
তীব্র গরমের কারণে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্রোগ-সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত মৃত্যুর বড় অংশই ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঘটেছে এবং ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সময়ে বাড়িতে মৃত্যুর হার আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাইয়ের এই সময়ে ফ্রান্সের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। অনেক এলাকায় রাতের তাপমাত্রাও ২০ ডিগ্রির নিচে নামছে না। এতে ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে তাপের চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপরও গভীর প্রভাব পড়ছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ফরাসি সরকার জরুরি বৈঠক করে বনাঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দাবানলপ্রবণ এলাকায় আগুন ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগও সতর্ক করেছে, আগামী কয়েক দিন উচ্চ তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে দাবানলের ঝুঁকিও বহাল থাকবে।