দুর্লভ কালো মাথা গুধুকা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩০ এএম

বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ঘুরতে ঘুরতে ২০১৪ সালের ২২ মে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাজির হলাম। ভোরে বাস থেকে নেমে জুবেরি হাউজে জিনিসপত্র রেখে ক্যাম্পাসটা একটু ঘুরে দেখলাম। রাজকীয় পাখি দুধরাজ, দুর্লভ শঙ্খশালিক, মেঘ হও মাছরাঙা, ধৌলি ফিঙে ও মাছমুরালের দেখা পেলাম। রেস্টুরেন্টে নাশতা সেরে গেস্ট হাউজে ফিরলাম। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ফের যখন বের হলাম। চমৎকার আবহাওয়া। তবে বেশ গরম। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর রোদের তেজ মারাত্মক বেড়ে গেল। রোদে টিকতে না পেরে গাছপালায় ছাওয়া উদ্ভিদ উদ্যানে আশ্রয় নিলাম। বেশ গরম, কিন্তু রোদের তেজ মাথায় লাগছে না। একটা চাপকল দেখে পানি খেলাম। চাপকলের পানি বেশ ঠা-া, প্রাণ জুড়িয়ে গেল। পুকুরপাড়ে তালগাছের নিচে বাঁশের মাচায় বসে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি দূর করলাম।

এরপর আবারও পাখি খোঁজা। নীলটুনি ও নীললেজ সুঁইচোরা দেখে পটাপট কয়েকটা ছবি তুললাম। সুঁইচোরাগুলো কলাগাছে বসে ছিল। সেখান থেকে চমৎকার ভঙ্গিতে উড়ে গিয়ে শূন্য থেকে উড়ন্ত পোকা ধরছে ও কলাগাছে ফেরত আসছে। একটা গগনশিরিষ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খানিকটা দূর থেকে সুঁইচোরার পোকা ধরার ছবি তুলছি। এমন সময় সামনের ঝোপালো ছোট গাছটাতে ধূসর রঙের একটা পাখি এসে বসল। পাখিটিকে আগেও বার কয়েক দেখেছি, বেশ দুর্লভ। কিন্তু ভালো ছবি তুলতে পারিনি। কাজেই এই সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না। দ্রুত কয়েকটা ক্লিক করতেই পাখিটি উড়াল দিল। আর ফিরে এলো না। পরের বছর আবারও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ওর দেখা পেলাম। প্রায় এক যুগ পর ঢাকার পূর্বাচলে একই প্রজাতির একটি স্ত্রী পাখির দেখা পেলাম। ঢাকায় এই পাখিটিকে প্রথম দেখলাম।  

এই দুর্লভ পাখিটি কালো মাথা গুধুকা। ছোট গুধুকা বা কালো মাথা কাবাসি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Black-headed Cuckooshrike। ক্যাম্পেফিজিডি (Campephagidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Lalage melanoptera (লালাজে ম্যালনপটেরা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নোপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে পাখিটির দেখা মিলে।

কালো মাথা গুধুকা লম্বায় মাত্র ২০ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৩০ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের দেহের রঙে পার্থক্য রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মাথা, কপাল, ঘাড়, গলা ও বুক কালো। পিঠ ছাই রঙা। দেহের নিচটা সাদা। ডানা ও লেজের প্রান্ত ছোপযুক্ত কালো। স্ত্রীটির চোখের ওপরে সাদা টান। সাদা বুকে আড়াআড়ি বাদামি রেখা অনেকগুলো। পেট সাদা। মাথা ও পিঠ ধূসর। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখ কালচে-বাদামি এবং ঠোঁট ও পা কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে কতকটা স্ত্রীর মতো, তবে পিঠে সাদা ডোরা থাকে।  

কম-বেশি সারা দেশে এদের দেখা মেলে, তবে দুর্লভ। আমি এদের লাউয়াছড়ার মিশ্র চিরসবুজ বন, গাজীপুরের আর্দ্র পাতাঝরা বন, তেঁতুলিয়ার খোলা প্রান্তর, এমনকি রাজশাহীর ছায়াঘেরা বাগানে দেখেছি। সচরাচরা একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। কীটপতঙ্গ ও শুঁয়োপোকা প্রিয় খাদ্য। তবে রসালো ফল ও ফুলের নির্যাসও খেতে পারে। ‘পুইট-পুইট-পুইট’ স্বরে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ১৫-২০ উচ্চতায় গাছের অপেক্ষাকৃত মোটা শাখায় বা দো-ডালায় শিকড়, লতা, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে ছোট্ট গোলাকার বাসা বানায়। এমনভাবে বাসাটি যেন তা সহজে কারো নজরে না আসে। স্ত্রী-পুরুষ দুজনে মিলেই বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৩টি। সাদা রঙের ডিমগুলোর ওপর বাদামি ফোটা ও লম্বা লম্বা দাগ থাকে। ডিম ফোটে ১৪-১৭ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ছানাদের খাওয়ায়। প্রায় এক মাস বয়সে ছানারা উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-১০ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত