পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে কয়েক জেলায় বন্যা আতঙ্ক

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৮ এএম

উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। গত বৃহস্পতিবার এফএফডব্লিউসি প্রকাশিত বন্যার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী ব্যবস্থার পানির স্তর কমেছে। তবে আগামী চার দিনে পানির স্তর বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পঞ্চম দিনে তা স্থিতিশীল থাকতে পারে। পূর্বাভাসে আরও বলা হয়, ৪ থেকে ৭ জুলাই (দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন) পর্যন্ত কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এতে সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, আগামী পাঁচ দিনে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে তা বিপদসীমার নিচেই প্রবাহিত হবে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা (উচ্চ মেঘনা) নদ-নদীর পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত থাকতে পারে। বর্তমানে নীলফামারীর ডালিয়া ও লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর তারাপুর পয়েন্ট, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলিতে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি নিজ নিজ সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সারদার উদয় রায়হান সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘জলবায়ুগত কারণে বাংলাদেশে জুলাই ও আগস্ট মাসে সব সময়ই বন্যার ঝুঁকি থাকে। এ সময়ে দেশের প্রধান নদীগুলোর অববাহিকা ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, যা দেশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।’ তিনি আরও বলেন, সে কারণেই চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে উজানের ঢল ও নদ-নদীর পানি ওঠানামায় দেশের তিনটি জেলার নদ-নদীতে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালু ভর্তি জিওব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

কুড়িগ্রাম : উজানের ঢল এবং নদ-নদীর পানি ওঠানামার প্রভাবে কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। আরও হাজার হাজার পরিবার শেষ সম্বল বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছে। এদিকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আবারও বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ায় নদী তীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

কুড়িগ্রাম পাউবো জানিয়েছে, জেলার ৪০টি ভাঙনকবলিত পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। গতকাল শুক্রবার পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার সব নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও বর্তমানে কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী ও রাজারহাটসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৪০টি পয়েন্টে ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বছর বছর নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বগুড়া : বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিওব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। কিন্তু ভাঙন ঠেকানো না যাওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ভয়ের কিছু নেই।

গত ১০ দিনে প্রায় ১৫০ মিটার নদীর পাড় ভেঙে যমুনায় বিলীন হয়েছে। আবার বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙনের ভয়ে আতঙ্কিত শহড়াবাড়ি গ্রামবাসী ও আশপাশের এলাকা।

জানা গেছে, ২৩ জুন ধুনট উপজেলার শহড়াবাড়ি যমুনা নদীর ঘাট এলাকায় জিওব্যাগ ও টিউব ফেলার স্থানে ফের ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। ভয়াবহ ভাঙনে প্রায় ৫৫ মিটার অংশের জিও ব্যাগ ও টিউবসহ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ নিয়ে ২১ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়। অথচ সেখানে ভাঙন ঠেকাতে প্রতিদিন বালু ভর্তি জিওব্যাগ এবং টিউব ফেলা হচ্ছে। নদীপাড়ের মানুষ ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, নদীতে স্রোত বেশি থাকায় ভাঙনের সূত্রপাত। আমরা প্রতিদিন ভাঙনের স্থানে বালুর ব্যাগ ফেলছি। যতক্ষণ পর্যন্ত ভাঙন রোধ না করা যাবে, ততক্ষণ কাজ চলমান থাকবে।

গাইবান্ধা : এদিকে গাইবান্ধার প্রধান চার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। তবে পানি কমার ফলে নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্তত ৭০০ বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চরাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাও প্রায় বিচ্ছিন্ন। এতে দুর্ভোগ বাড়ছে। তীব্র ভাঙনে দিশেহারা নদী-তীরবর্তী মানুষ।

জানা গেছে, এরই মধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর, গজারিয়া, টেংরাকান্তি, রতনপুর, বানিয়াপাড়া, দেলুয়াবাড়ি, তালতলার খাটিয়ামারিসহ কয়েকটি চওে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। এসব এলাকার কয়েকশ পরিবারকে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গত এক সপ্তাহে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৫ শতাধিক বসতভিটা, আবাদি জমি ও রাস্তাঘাট। জানা গেছে, উপজেলার কাপাসিয়া, বাংলাবাজার মোড়, চালচামার, বেলকা, হরিপুর, দহবন্দ, শান্তিরাম, শ্রীপুর, চন্ডিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ জেলার সবকটি নদীর পানি কমছে। তবে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় অন্তত ২৬টি পয়েন্টে ভাঙছে দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় ভাঙন রোধ কাজ শুরুর কথা জানানোর পাশাপাশি এই আবহাওয়াতে বড় বন্যা হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলেও জানিয়েছে পাউবো।

রবিবার থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে : এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে এবং এর প্রভাবে আগামীকাল রবিবার থেকে দেশজুড়েই বৃষ্টি শুরু হতে পারে। আজ শনিবার সন্ধ্যা থেকেও দেশের কিছু এলাকায় বৃষ্টি বাড়তে পারে বলে গতকাল শুক্রবার আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লঘুচাপটি এখন ভারতের ওড়িশা উপকূলে রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা গণমাধ্যমকে বলেন, লঘুচাপটি নিম্নচাপেও পরিণত হতে পারে। নিম্নচাপ হলে রবিবার থেকে এর প্রভাবে বৃষ্টি বাড়তে পারে। তিনি বলেন, লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হলে মূলত উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি বেশি হতে পারে। চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা এলাকায় এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। 

সদ্যবিদায়ী জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ২৯ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে। তবে চলতি জুলাই মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে বলে মাসের শুরুতে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। এ মাসে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তাপপ্রবাহও থাকতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত