যমজ দুই সহোদর আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪)। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তাদের পূর্বপুরুষ ইরানি। দুই ভাইও দীর্ঘদিন ইরানে থেকেছেন। সে সময় সিসা (মাদক) ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে দেশে ফিরে ইরানি ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা জালে দুই সহোদরসহ তিনজন ধরা পড়ে যান। গ্রেপ্তার আরেকজন মো. মাকসুদ আলম (৪০)। তাদের কাছ থেকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সিসার চালান অর্থাৎ ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা, ৫টি মোবাইল ফোন ও বিপুল পরিমাণ সিসা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন।
তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম। তারা ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করতেন। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠাতেন। ওই পেইজের মাধ্যমে অর্ডার করা দুটি সিসার চালান কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হবে, এ তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার ভাটারা থানাধীন এলাকায় প্রথম অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো ১ কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। তারপর একই দিন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো আরও ১ কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়। জব্দ করা পার্সেল দুটির প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে আভিযানিক দল একই দিনে গুলশানের কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ওই দুই সহোদরকে হাতেনাতে আটক করে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ এবং ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত দুই সহোদর জানায়, তাদের সরবরাহ করা সিসার একটি বড় অংশ আসত মো. মাকসুদ আলম নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। পরে ওইদিন রাতে মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
চক্রটি বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে। জব্দ করা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করেছে ডিএনসি। এতে দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।