প্রচ্ছদ রচনা

কাফকার আগে ও পরে বিশ্বসাহিত্য : দুষ্পাঠ্য বাস্তবতার উত্তরাধিকার

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৬ এএম

ফ্রানৎস কাফকার প্রথম গল্প যখন প্রকাশিত হচ্ছে ১৯০৮ সালে, জার্মান সাহিত্যের মুখ্য চরিত্র তখন টোমাস মান, বাডেনব্রুকস লেখা হয়ে গেছে সাত বছর আগে। ১৯১২ সালে মান লিখে ফেললেন আরও এক বিখ্যাত নভেলা ভেনিসে মৃত্যু, সেই বছরে কাফকাও লিখেছেন রূপান্তর। প্রথমটা প্রকাশমাত্রেই মান-এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ি ফুলের সৌরভের মতো, ইউরোপ হয়ে যা পাড়ি দিল অতলান্তিক মহাসাগরের ওপারেও। কিন্তু রূপান্তর সে বছর প্রকাশিতই হলো না, হলো আরও তিন বছর পর ১৯১৫-তে। বইটা পাঠকের হাতে ওভাবে না পৌঁছলেও, সাহিত্য সমালোচকদের কেউ কেউ নড়েচড়ে বসলেন। সে বছর প্রখ্যাত জার্মান নাট্যকার কার্ল স্টার্নহেইম তার জেতা থিওডর ফন্টেইন পুরস্কারের সম্পূর্ণ প্রাইজমানিটা পাঠিয়ে দিলেন কাফকার ঠিকানায়, সহায়তা হিসেবে নয়, লেখকের প্রতি লেখকের সম্মানের স্মারক হিসেবে। স্টার্নহেইম রূপান্তর পড়ে হয়তো বুঝে নিয়েছিলেন কাফকার অমিত সম্ভাবনা, বুঝেছিলেন ঐ সময়ের প্রথাবিরোধী জার্মানভাষী লেখক বুদ্ধিজীবীদের একাংশও।

কিন্তু সে বড় সীমিত পরিসর। কাল্টের মতো। জার্মান ভাষার সুবিশাল সাহিত্যিক দৃশ্যপটে তখন কত বড় সব নাম। হেরমান হেস, স্তেফান সোয়াইগ, জারহার্ট হফতমান, রাইনার মারিয়া রিলকে। সেই খ্যাতির আলোয় কাফকা কোথায়? তার ওপর রূপান্তরের প্রকাশ পরবর্তী বছরগুলোর কোথাও তার স্বস্তি নেই। ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন, নারী বিষয়ক জটিলতা, অসুখে ক্ষয়প্রাপ্ত আত্মদ্বন্দ্বে মুখর সময়। ১৯২৪ সালে যখন তিনি মৃত্যু ও বিস্মৃতির মুখে দাঁড়িয়ে, সে বছরই প্রকাশ পায় টোমাস মানের আরেক অজর কীর্তি জাদুপাহাড়

টেনেটুনে কাফকার প্রকাশ্য সাহিত্যিক জীবন পনেরো বছরের। এবং এই স্বল্প সময়েই যা তিনি লিখে গেছেন, ওসব আশ্চর্যজনকভাবে তার সমকালীন ও পূর্বজ লেখকদের চেয়ে একেবারেই আলাদা রকমের। আলাদা বলেই কি বিংশ শতকের সাহিত্যে কাফকা হয়ে উঠেছিলেন এক অক্ষশক্তি? অর্থাৎ, কাফকা লিখলেন আর সাহিত্য আগের মতো থাকল না, চিরতরে বদলে গেল? উত্তর হ্যাঁ, এবং না। ‘হ্যাঁ’, কারণ কাফকা তার চারপাশের বদলে যাওয়া বাস্তবকেই নিজস্ব ন্যারেটিভের অনুষঙ্গ করে তুলেছিলেন। নিজের পূর্বজদের মতো ন্যারেটিভ ও চিন্তার কাঠামোয় বাস্তবতাকে বন্দি করার চেষ্টা করেননি। ‘না’, কারণ কাফকা একদম উত্তরাধিকারবিহীন আনকোরা কিছু লিখেছেন বলে মনে হয় না। প্রিয় লেখক তারও ছিল, প্রভাবক ছিল, আর সেই প্রভাবের ধারা থেকেই তিনি পেয়েছিলেন পৃথিবী দেখার নতুন দৃষ্টি।

এ প্রসঙ্গে ১৯১৩ সালে প্রেমিকা ফিলিক্স বাওয়ারকে লেখা একটা চিঠিতে কিছু কথা পাওয়া যায়, কাফকা লিখছেন, চারজন লেখকের সঙ্গে তিনি রক্তের সম্পর্ক অনুভব করেন। তারা হলেন গুস্তাভ ফ্লবেয়ার, ফিওদর দস্তইয়েফস্কি, হাইনরিখ ভন ক্লাইস্ট, এবং ফ্রানৎস গ্রিলপারজার। এখানে, আমরা বিশেষ করে দুজন লেখকের দিকে চেয়ে দেখতে পারি।

কাফকা যে বলেছিলেন তিনি ‘সাহিত্যে গড়া’, এই ধারণাটি সাহিত্যিক হিসেবে ফ্লবেয়ারের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, লেখার সুবিধা কীসে কীসে হয় সেভাবেই দৈনন্দিনতাকে সাজিয়ে নেওয়া–মনে হয় যে এসব থেকেই উৎসারিত; এমনকি চিঠিতে নিজস্ব ভাবনাচিন্তা ও যাপন ধরে রাখার বিষয়টিতেও তার অনুপ্রেরণা ছিলেন ফ্লবেয়ার, ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন মন ভরে প্রিয় লেখককে পড়বেন সে উদ্দেশ্যে। বলা বাহুল্য,  সেন্টিমেন্টাল এডুকেশন ছিল কাফকার প্রিয়তম উপন্যাস। এমনকি শব্দ-বাক্য ব্যবহারের পরিমিতি প্রসঙ্গে কাফকার যে কিংবদন্তিসম খুঁতখুঁতে স্বভাব, ঋজু গদ্য, এবং বর্ণনার ভনিতাহীন অকপটতা–এসব শূন্য থেকে আসেনি, ফ্লবেয়ারের প্রভাব এখানে বেশ স্পষ্ট করেই বোঝা যায়।

কিন্তু দার্শনিক লব্ধির জায়গা থেকে কাফকাকে যার সঙ্গে খুব বেশি সংযুক্ত করা সম্ভব, সেই লোকটি মনে হয় দস্তইয়েফস্কি। দস্তইয়েফস্কির চরিত্রদের অপরাধবোধ, নিজেকে দোষারোপ, স্বীকারোক্তির মনোভাব ও শাস্তির ধারণা কাফকার গল্প উপন্যাসে এসেছে আয়নার প্রতিবিম্ব হয়ে, কারণ জোসেফ কে-র বাস্তবতা ব্যাখ্যার অতীত হলেও সেখানে শাস্তির হাত থেকে কেউ রক্ষা পায় না, অনুশোচনার মূল্য না থাকলেও অব্যাখ্যাত বাস্তবতাকে ধরার চেষ্টায় চরিত্রগুলো ভেবে নেয় নিশ্চয়ই তার অপরাধ আছে, তাই সে দণ্ড পাচ্ছে।

যেমন, বিচার উপন্যাসে জোসেফ কে. যখন গ্রেফতার হয়, প্রথমত সে বোঝেই না কী তার অপরাধ, কেউ তাকে বলেও দেয় না কেন সে গ্রেফতার হলো, কিন্তু ক্রমে কাহিনির এক পর্যায়ে আদালতের দেওয়া রায়ের আলোকে সে নিজেকে নিজেই বিচার করতে শুরু করে, নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টারত হয়, ভাবতে থাকে তার জীবনের এমন নির্মম পরিণতির পিছনে নিশ্চয়ই তার নিজেরই হাত আছে, না থেকে পারে না। অর্থাৎ, আদালত এক সময় তাকে দিয়েই স্বীকার করিয়ে নিতে সক্ষম হয় যে সে অপরাধী।

দস্তইয়েফস্কির রাসকোলনিকভ আর কাফকার জোসেফ কে. দুটি চরিত্রই সমাজের নির্মম সিস্টেমের ফসল, সমাজ যাদের দিয়েছে অনন্ত আতঙ্ক, ক্রমাগত নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহপ্রবণতা, আর গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া সংশয়। রাসকোলনিকভের ক্ষেত্রে অপরাধই তার শাস্তি খুঁজে নেওয়ার একটা যাত্রা করে সেইন্ট পিটার্সবার্গের দমবন্ধ প্রাণহীন নাগরিক পরিবেশে, আর জোসেফ কে-র ব্যাখ্যাহীন শাস্তিই এক অনিঃশেষ ও ক্লান্তিকর নামহীন শহরের গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে ফেরে তাকে মান্যতা দেবার মতো অপরাধ।

কিন্তু এ তো গেল কাফকার অনুপ্রেরণার উৎসমুখের কথা, আমরা যদি তাকে একটা সমান্তরাল রেখা ধরে তার আগে ও পরের বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকাতে যাই, আমাদের ফিরতে হবে, বিশেষ করে পশ্চিমা সাহিত্যিক ধারাবাহিকতার আলাপেই। এই ধারাবাহিকতা কাফকার আগ পর্যন্ত মূলত কাঠামোগত বিবর্তনেরই আলাপ। অর্থাৎ মহাকাব্য থেকে লিরিকাল কবিতা, রোমান্টিসিজম থেকে সেন্টিমেন্টাল থেকে বাস্তববাদী ঘরানার উপন্যাস, যেখানে মানুষের যাপনের প্রকৃতি, সম্পর্ক ও সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও দর্শনের ধারণা উপন্যাসের নির্দিষ্ট একটা ছাঁচে ফেলে লিখতেন লেখকেরা, উপন্যাস যেখানে আসলে একরকমের পরীক্ষাগার, ব্যক্তির বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের কালিক দলিলও।

কিন্তু কাফকা যখন লিখছেন, পৃথিবী বদলে যাচ্ছিল, ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছিল নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনীতির দিকে, এমন এক মহাযুদ্ধের দামামা বাজছিল যা আসলে রাষ্ট্রগুলোর না, গোটা পৃথিবীর চেহারাই বদলে দিচ্ছে। সমসাময়িক টোমাস মানের লেখায় যেখানে ক্ষয়প্রাপ্ত প্রাক্তন বুর্জোয়া ব্যবস্থার রদবদলের ক্লেদ, হারিয়ে যাওয়া সুন্দরের জন্য হাহাকার, ইউরোপ কীভাবে খণ্ড বিখণ্ড হতে শুরু করল এলিটদের অন্তঃস্বারশূন্যতার নানামুখী প্রভাবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিবরণ বিশ্লেষিত হচ্ছে, কাফকার চোখে তখন আরেক পৃথিবী। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ক্রমশ অনঢ় আমলাতান্ত্রিকতার জটাজালে বিদ্ধ আধুনিক সমাজে নিতান্ত ছাপোষা মানুষের অবশ্যম্ভাবী পতন। স্তেফান সোয়াইগ ততদিনে তার ক্ষুরধার মনোবিশ্লেষণের সঙ্গে অভিযানের নির্যাস মিশিয়ে লিখে ফেলেছেন আমক, কিন্তু কাফকার তো অভিযানও নেই। তার আছে অনন্ত ক্লান্তি। ইউরোপের আরেক প্রান্তে তখন স্ট্রিম অব কনশাসনেসের জয়জয়কার। জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ, মার্সেল প্রুস্ত ঢুকে পড়তে চাইছেন মানুষের স্মৃতি ও গোপন ক্ষতের অতি গহনে, মুহূর্তের অবারিত ভাবনার ক্রসচেক তারা গেঁথে ফেলতে চাইছেন উপন্যাসের উন্মত্ত এক কাঠামোয়, যেখানে পূর্বসূরিদের নিরেট গল্পবলিয়ে আত্মা ঘোলাটে হয়ে গেছে, বরং চিন্তার লাগামছাড়া দশার মতোই ওদের সাহিত্য আবিষ্কার করতে চাইছে ব্যক্তির চূড়ান্ত রূপ, বিকৃতি ও বিবর্তনকে।

ঠিক এইখানে এসেই কাফকা আসলে আলাদা হয়ে গেলেন। তার মনে হলো, ব্যক্তিকে যে ধরব, সেই ব্যক্তি কোথায় বাস করে? সমাজে? কেমন সে সমাজ? যেমনই হোক, তাকে তো আর আমি পড়তে পারছি না। তার কার্যকারণ, যুক্তি, অর্থ কিছুই তো আর বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করতে তৈরি হয়ে গেছে অসংখ্য আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি। কে কী করবে জীবনে, তা ঠিক করে দিতে চাইছে একটা কদাকার সিস্টেম, যার নিগঢ়ের বাইরে যাবার ক্ষমতা মানুষের আছে কি না সে জানে না, কিংবা যাওয়ার সাহসও তার মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই। তাই আইনের দরজায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বিভ্রান্ত হয়ে, ভেতরে প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে না, আর মৃত্যুর আগে পাহারাদার বলছে দরজাটা তার জন্যই বানানো হয়েছিল। এমন নাজেহাল দশা যে মানুষের, তার কাছে স্মৃতির কী মূল্য? তার দিনরাত তো কেটে যাবে বিরাট এক যন্ত্রের এক টুকরো স্ক্রু বা বড়জোর একটা মেশিনারি হয়েই।

বাস্তবতার এই যে দুষ্পাঠ্য ঘোলাটে চেহারা, যাকে কোনোভাবেই আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব না–একেই লিখেছেন কাফকা, যা ধারণ করার জন্য পুরনো সাহিত্যিক কাঠামো যথেষ্ট ছিল না। গ্রেগর সামসা পোকা কীভাবে হয়ে গেল সে কার্যকারণ তাই কাফকায়েস্ক জগতে অপ্রয়োজনীয়, চরিত্রের পূর্বাপর কথা ও কাহিনির অনুপস্থিতি টের পাওয়ার ফুরসত মেলে না, আদর্শ-অনাদর্শের খেলা যেখানে দাঁত বসাতে অক্ষম, কিন্তু পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার ফলে তার পরিণতি বর্ণনায় লেখক ক্ষমাহীন। এই কাজটি করতে গিয়েই তার আগ পর্যন্ত চলে আসা সাহিত্যিক কাঠামোকে ভেঙে ফেললেন তিনি। যত না সাহিত্যিক কৌশলে, তারচেয়েও বেশি বাস্তবতা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে। যেখানে মহাশক্তিধর ও অমোঘ ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের লড়াই চলে না, মানুষ কচুকাটা হয়, থেঁতো হয়ে যায় পোকার মতো।

নিকটতম সহচর ম্যাক্স ব্রড কাফকার লেখালেখি প্রকাশ করতে থাকেন বন্ধুর মৃত্যুর পরের বছর থেকে (১৯২৫)। তবে কাফকা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন আরও পরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। এই যুদ্ধে শতাব্দীর নৃশংসতম গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ তখন শিল্পসাহিত্যে নৈরাশ্যবাদের জন্ম দিয়েছে। এসবের মাঝখানে কাফকার লেখা ধরা দিল ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। যার প্রভাব এড়ানো সম্ভবই না বলতে গেলে, কারণ, মানুষ তখন কাফকাবর্ণিত ব্যাখ্যাহীন নৃশংস বাস্তবতায় সরাসরি ঢুকে পড়েছে। শিল্প-সাহিত্যে বাস্তবতা এবং অ্যাবসার্ড মিলেমিশে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়।

জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ কিংবা আর্থার কোয়েস্টলারের ডার্কনেস এট নুনকে নানান কারণে কাফকায়েস্ক বলা যেতে পারে। যদিও এ দুই উপন্যাসের বক্তব্য কাফকার রচনার তুলনায় অনেক বেশি সরাসরি এবং রাজনৈতিক। কিন্তু এগুলো কাফকার সেই সাহিত্যিক বাস্তবতারই সমসুর যেখানে প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম আমজনতাকে নিজ চোখে দেখা সত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করতে পারে। অরওয়েলের পক্ষে আমলাতান্ত্রিক ভাষা, উদ্ভট সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা, এবং সত্যের সদা পরিবর্তনশীল রূপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল, কারণ ওরকম কিছু লিখে ওঠার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল প্রাসাদ কিংবা বিচারের মতো বইগুলোই।

বলা যেতে পারে আলবেয়ার কাম্যুর কথাও। যদিও কাফকার অ্যাবসার্ড কাম্যুর সাহিত্যে এসে ভিন্ন অর্থ নিয়েছে, যেখানে কাম্যুর চরিত্ররা পৃথিবীর অব্যাখ্যাত অর্থহীনতার শিকার, কিন্তু সেটা মেনে নিয়েই নিজের মতো বেঁচে থাকার রাস্তা খুঁজতেও উদ্বুদ্ধ, অর্থাৎ এখানে যোগ হয় প্রতিরোধ। কাফকায় প্রতিরোধ নেই, এমন বলা যায় না, কিন্তু সেই প্রতিরোধ যেন আরও বেশি করে দণ্ডের জালে জড়িয়ে যাওয়ার একটা ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।

বলা যেতে পারে একাধারে স্যামুয়েল বেকেট, হ্যারল্ড পিন্টারের মতো নাট্যকারদের কথাও। কারণ এদের জগতে অর্থহীনতা ও প্যারানয়া আসে কাফকার মতোই সরল ভাষার ছদ্মবেশ ধরে। চেনা জগতের ঠিক নিচের স্তরেই তৈরি হয় একটা ভীতি ও নৈরাশ্যের ভরকেন্দ্র। বেকেটের গডো আসলে কে, যে নিজেই নৈরাশ্য, কিন্তু আশার প্রতীক হয়ে আছে মানুষের কাছে? ঠিক বিপরীতভাবে হোর্হে লুইস বোর্হেসের গল্পগুলো গ্রহণ করে কাফকার রূপকের ব্যবহার, ধাঁধা ও ধোঁয়াশাপূর্ণ জগৎ নির্মাণের কৌশল। অর্থাৎ বোর্হেস নেন কাফকার জটিলতা, কিন্তু অর্থময়তার দিকেই তিনি হাঁটেন, অথচ দেখি ‘বাবেলের গ্রন্থাগার’ কড়া গাণিতিক নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েও চিন্তাকে নিয়ে যায় অসীমের দিকে, যা আসলে আমাদের চেতনার বিপরীতে এক আশ্চর্য শূন্যতা তৈরি করে। এই প্যারাডক্সও কি এক অর্থে কাফকায়েস্ক নয়? 

আরও পরের প্রজন্ম, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস থেকে শুরু করে সালমান রুশদি কিংবা মিলান কুন্ডেরা বা লাসলো ক্রাস্নাহোরকাই থেকে হারুকি মুরাকামি, যার লেখাই পড়তে যাই, মনে হবে যে বাস্তব অবাস্তবের যে দেয়াল নিজেদের লেখায় তারা ঝাপসা করে দিতে পেরেছেন, সেই অনায়াস কৌশলে কাফকার চেয়ে আর বেশি কারই বা ছায়াপাত আছে?

কিন্তু অ্যাবসার্ড ড্রিম লজিক বা উদ্ভট ঘটনার সমাবেশই তো কাফকা নয়। আধুনিক পৃথিবীটা আসলে আর কোনো অর্থই তৈরি করে না, বরং পুরনো অর্থগুলোকেও প্রতিনিয়ত অসার প্রমাণ করে চলে–এমন জগতে কীভাবে চলবেন, তার টোটকা হলেন কাফকা। সে কারণেই এই পোস্ট ট্রুথের পৃথিবীতেও তিনি প্রভাবশালী সাহিত্যিক, পপ-কালচারের অনুষঙ্গ, ক্রমাগত মানবসভ্যতার অসারতা নিয়ে লেখার পরেও অন্যতম মানবতাবাদী লেখক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত