রাশিয়ার ক্রমাগত আকাশপথের হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ভরসা এবং কাঙ্ক্ষিত অস্ত্র হলো পশ্চিমা প্রযুক্তির ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর। তবে রুশ বাহিনীর ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন এক সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে আশার আলো দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিয়েভকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লাইসেন্স দিয়েছেন তিনি।
তুরস্কে চলমান ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে গত বুধবার (৯ জুলাই) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দিতে যাচ্ছি। আমরা তাদের এটি তৈরির কৌশল দেখিয়ে দেব। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল হলেও তোমরা দ্রুতই এর প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এর ফলে তোমরা অন্তত আর অভিযোগ করতে পারবে না যে আমরা তোমাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র দিচ্ছি না।”
তবে এই উৎপাদন কবে নাগাদ শুরু হতে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন তার নিজস্ব অস্ত্রের মজুত নিজেদের কাছেই রাখবে। অন্যদিকে ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা যত দ্রুত সম্ভব এই দেশীয় উৎপাদন প্রক্রিয়া রপ্ত করার চেষ্টা করবে।
জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন আল জাজিরাকে বলেন, স্বল্পমেয়াদে এই চুক্তি থেকে ইউক্রেনের হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো লাভ হবে না। তবে মার্কিন প্রযুক্তির এই প্রবেশাধিকার ইউক্রেনের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ও কাউন্টার-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে উল্লেখযোগ্যভাবে গতিশীল করবে। তিনি মনে করেন, ইউক্রেন হয়তো তুলনামূলক সস্তা এবং সহজ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দেবে, যা তৈরি করতে এক বছরেরও কম সময় লাগতে পারে। মিত্রোখিন আরও বলেন, ‘এমনও হতে পারে যে এই কর্মসূচিটি ইতিমধ্যেই গোপনে চালু ছিল এবং এখন তা কেবল জনসমক্ষে আনা হয়েছে।’
ইউক্রেন মূলত প্যাট্রিয়ট সারফেস-টু-এয়ার (ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য) ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র অংশটি তৈরি করতে চাইছে। পুরো প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও রয়েছে লঞ্চার, রাডার এবং একটি নিয়ন্ত্রণ যান (কন্ট্রোল ভ্যান)। এই নিয়ন্ত্রণ যানের কারণেই পুরো ব্যবস্থাটিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়, যা শত্রুর নজরদারি ও পাল্টা হামলা এড়াতে সাহায্য করে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বড় অস্ত্রের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে বা সম্মুখ সমরে বড় পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে ছোট ছোট ড্রোন বা ‘লিটল বার্ডস’।
সম্প্রতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের একটি নো-ম্যানস ল্যান্ডের বনাঞ্চলের ৮০ মিটার ওপরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ইউক্রেনের একটি গুপ্তচর ড্রোন। ড্রোনটির অপারেটর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চিমে কয়েক ডজন কিলোমিটার দূরে একটি বাঙ্কারে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখছিলেন, কীভাবে ধূসর-সবুজ ক্যামোফ্লেজ পোশাক পরা একজন রুশ সেনা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে আছেন।
সেনা সনাক্তকরণের এই দৃশ্যটি আল জাজিরা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করেছে। ইউক্রেনীয় অপারেটর ড্রোন থেকে পাওয়া ভিডিওর মাধ্যমে রুশ সেনার অবস্থান নিশ্চিত করে দ্রুত সহায়তার জন্য সংকেত পাঠান। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে একটি বিস্ফোরক বোঝাই কামিকাজে ড্রোন এসে সরাসরি সেই গর্তের ওপর আঘাত হানে।
এই ইউনিটের কমান্ডার নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের নাম এবং সঠিক অবস্থান প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি ড্রোন থেকে লাইভ ভিডিও স্ট্রিম পাই।’ এই দৃশ্যটি এখন ইউক্রেন ও রুশ সেনাদের প্রতিদিনের জীবন-মৃত্যুর স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা হাজার বছরের পুরোনো প্রথাগত সম্মুখ যুদ্ধের ধারণাকে বদলে দিয়েছে- যেখানে সেনারা সরাসরি একে অপরকে দেখে গুলি করত।
২০২২ সালে যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়, তখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দুটি সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণকৌশল ব্যবহার করে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং কামানের ওপর নির্ভর করে লড়াই করছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কৌশলগুলো প্রায় বিলুপ্ত।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক জেমস্টাউন ফাউন্ডেশনের সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিন আল জাজিরাকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’ এর মাধ্যমে কমান্ডার, মাঠপর্যায়ের সেনা এবং অস্ত্রের মধ্যে রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা এনে দেয়।
বর্তমানে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে সেনা নিয়োগের সংকট এবং দলত্যাগের ঘটনা বাড়ায় তারা প্রযুক্তিগত সমাধানের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফ্রন্ট লাইনে এখন এমন সব গ্রাউন্ড রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে যা শত্রুর বাঙ্কার উড়িয়ে দিতে পারে, মেশিনগান চালাতে পারে এবং খাবার, গোলাবারুদ সরবরাহসহ আহত সেনাদের উদ্ধার করতে পারে।
পশ্চিমের শহর তেরনোপিলের রোবোটিক কমপ্লেক্স কোম্পানির প্রধান ইহোর চাইকিভস্কি বলেন, আমাদের যদি পর্যাপ্ত সেনা থাকত, তবে জেনারেলরা এখনো সেনাদেরই ফ্রন্ট লাইনে পাঠাতেন। কিন্তু আমরা পরিখায় মরতে চাইনি বলেই গ্রাউন্ড রোবটের ব্যবহার শুরু করেছি।
কিছু প্রযুক্তি সাধারণ মনে হলেও অন্যগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। গুগলের সাবেক সিইও এরিক স্মিটের কোম্পানি সুইফট বিটের তৈরি সাশ্রয়ী মূল্যের ‘হরনেটস’ ড্রোন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রুশ জ্বালানি ট্যাংকার, সরবরাহ ট্রাক এবং সামরিক বহর নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। এই ড্রোনগুলোকে রাশিয়ার ইলেকট্রনিক জ্যামিং পদ্ধতি দিয়েও থামানো যায় না।
আন্দ্রি নামের একজন ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটর জানান, তারা এখন শত্রুপক্ষের সেনা খোঁজার কাজটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ছেড়ে দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, গাছের পাতার আড়ালে আমি হয়তো কাউকে মিস করতে পারি, কিন্তু এআই তা করবে না। তখন শত্রুদের লুকানোর আর কোনো জায়গা থাকবে না।
এদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা এখন রাশিয়ার ইউরোপীয় অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিন বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ না করে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রাশিয়ার বিশাল ভৌগোলিক আয়তন- যা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্মিলিত আয়তনের কাছাকাছি—কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ১৪ কোটি ৫০ লাখের কম হওয়ায় এর বিমান প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ইহোর রোমানেনকো বলেন, তাদের যে প্রযুক্তি রয়েছে তা দিয়ে এই বিশাল অঞ্চলের বিমান প্রতিরক্ষা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সামগ্রিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার জন্য তাদের আরও অনেক সরঞ্জামের প্রয়োজন।’
গত মঙ্গলবার সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহরে রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়। একই দিনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেন, এই যুদ্ধ আকাশেই জয় করা হবে। আকাশসীমায় আমরা ইতিমধ্যেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করেছি। চূড়ান্ত লড়াই আকাশেই হবে।
তবে জেলেনস্কির সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি সতর্ক করে বলেছেন, কেবল এই হামলা দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় আসবে না। দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লেখেন, এই আক্রমণগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। রাশিয়ারও সমান বা তার চেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে পাল্টা আঘাত করার ক্ষমতা রয়েছে। কোনো পক্ষই কেবল এই যুদ্ধকৌশলের ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত কৌশলগত ফলাফল অর্জন করতে পারবে না।
বাস্তবেই রাশিয়ার পাল্টা আঘাতের ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোরে কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে রাশিয়ার এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যাতে কিয়েভ ও এর আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ২৭ জন নিহত হন। সেই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কাতেরিনা বাবিচ নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম নতুন বহুতল ভবনগুলোর আড়ালে আমাদের বাড়িটি নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমাদের জানালার কাচ ও দরজা ভেঙে পড়ে এবং একটি আলমারি আমার ডায়াবেটিক আক্রান্ত ছেলের গায়ের ওপর পড়ে সে আহত হয়।’
পর্যবেক্ষকদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কবে নাগাদ শান্তি আলোচনায় বসতে রাজি হবেন তা বলা কঠিন। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির মিত্রোখিন বলেন, কিয়েভ রাশিয়ার অবকাঠামোতে আঘাত চালিয়ে যেতে পারে, তবে প্রশ্ন হলো এই সাফল্যগুলো কখন চুক্তিতে রূপান্তর করা যাবে। পুতিন কখন তার যুদ্ধংদেহী অবস্থান থেকে সরে আসবেন তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে কিয়েভের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য মার্কিন প্রশাসনকে একটি নতুন স্তরে শান্তি আলোচনা শুরু করার বিষয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। কিয়েভভিত্তিক থিংক ট্যাংক পেন্টার প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, ইউক্রেন মার্কিন পক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে শান্তি আলোচনার ধরন পরিবর্তন করা দরকার। এখন ইউক্রেনের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে নয়, বরং যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। ক্রেমলিন এখনো প্রস্তুত না হলেও মার্কিন পক্ষ এখন এই যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতির দিকেই ঝুঁকছে।’
সূত্র: আল জাজিরা