চলে গেলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার

সংসদে শোক প্রস্তাব

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

প্রবীণ আইনজীবী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল রবিবার ভোর ৪টা ১৯ মিনিটের দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে শোক প্রস্তাব।

এ ছাড়া জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে পৃথক বার্তায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে (চেম্বার আদালতসহ) অর্ধদিবস বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

জমির উদ্দিন সরকার বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জমির উদ্দিন সরকার মৃত্যুকালে এক কন্যা ও দুই পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। তার সহধর্মিণী নূর আখতার ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৬১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আইন পেশায় যুক্ত হন। সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তিনি। জমির উদ্দিন সরকার ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা : জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গতকাল জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। সংসদের বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিনে সাবেক এই স্পিকারের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ‘সেলফ-মেড ম্যান’। নিজের মেধা দিয়ে তিনি বড় হয়েছেন। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি কোনোদিন নির্বাচনে হারেননি। গণতন্ত্রের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা তাকে সবসময় ‘সুটেড-বুটেড’ আপাদমস্তক একজন জেন্টলম্যান হিসেবে দেখেছি। তিনি আমাদের পিতৃতুল্য ছিলেন”।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে যখন আমরা আইনের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিলাম, তিনি আমাদের মজলুম নেতাদের পক্ষে আদালতে বারবার দাঁড়িয়েছেন। আমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ফি দিতে চাইলেও তিনি এক টাকাও নেননি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে দূর থেকে হ্যাট, কোট আর ছাতা হাতে কাউকে দেখা গেলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তার মক্কেলদের বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন।’

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জাতি আজ এক মহান রাজনীতিক ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। এই চেয়ারে বসে (স্পিকারের দায়িত্বে) তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।’

সংসদে মরহুমের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন সংসদ সদস্যরা। পরে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এরপর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অংশ নেন। জানাজা শেষে সংসদ ভবন চত্বরে তাকে দাফন করা হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তার লাশ নিজ জন্মস্থান পঞ্চগড়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত