ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) মো. ফিরোজ। তবে তার সম্পদের পরিমাণ চমকে ওঠার মতো। স্বল্প বেতনের চাকরি করে ঢাকায় যেখানে লড়াই করে টিকে
থাকার কথা, সেখানে ফিরোজের আছে মোট ১৭ কাঠা জমি। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে পাঁচ কাঠার ওপর গড়ে তুলেছেন তিনতলা ভবন। ভোলায় গ্রামের বাড়িতেও প্রায় ছয় কাঠা জমিতে ভবন নির্মাণ করেছেন।
মো. ফিরোজের এমন ‘রাজকপাল’-এর পেছনে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাকরি গ্রহণ, জেলা কোটা পরিবর্তনের অভিযোগও গেছে সেখানে।
ফিরোজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সাত মাস আগে কমিটি করেছিল ঢাকা জেলা প্রশাসন। তবে ‘অদৃশ্য কারণে’ এতদিনেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। এসব বিষয় জানিয়ে গত ১৯ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী নুরে আলম নোমান সালমান।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাগত সনদ অনুযায়ী মো. ফিরোজ ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। বাবার নাম মো. ইউসুফ। তবে ২০১৫ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) পদে আবেদনের সময় তিনি রাজধানীর বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের আবেদন করার সুযোগ ছিল। অথচ ফিরোজ ভোলার বাসিন্দা হয়েও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পান।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির পর পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় ফিরোজের স্থায়ী ঠিকানা ভোলার চরফ্যাশন হওয়ার কারণে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাননি। এরপর তিনি মিরপুরের মো. অহিদ উল্লাহর পালক সন্তান হিসেবে কাগজপত্র তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেন। আর সেই কাগজের ভিত্তিতেই তিনি চাকরি করে যাচ্ছেন। প্রায় ১১ বছর ধরে একই কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফিরোজের শিক্ষাগত সনদে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ভোলার চরফ্যাশনের আমিনাবাদ গ্রামের নাম রয়েছে। এছাড়া ২০১১ সালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে করা সিআর মামলা নং-১৯৮/১১-এর এজাহারে এবং ২০০৮ সালের ধানম-ি থানার মামলা নং-৮৩(১)/০৮-সংক্রান্ত ওকালতনামায়ও তিনি একই স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। তার বিরুদ্ধে আইনজীবী নুরে আলমের করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ফিরোজ তার জাতীয় পরিচয়পত্র তিনবার সংশোধন করে একেকবার একেক ঠিকানা ব্যবহার করেন। একটিতে ভোলার চরফ্যাশনের ঠিকানা এবং অন্য দুটিতে রয়েছে ঢাকার মিরপুর ও পশ্চিম কারওয়ান বাজারের ঠিকানা।
অভিযোগে বলা হয়, ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় দায়িত্ব পালনের সূত্রে বিভিন্ন সরকারি কাজ নিয়ে আসা মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফিরোজ তদবির বাণিজ্য শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে আছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার বাগনা মন্দির এলাকায় প্রায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর তিনতলা বাড়ি। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। সাভার এলাকাতে আছে প্রায় ছয় কাঠা জমি। এছাড়া ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ছয় কাঠা জমির ওপর একটি ভবন নির্মাণ করেছেন, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তার এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম মোল্লা ও নুরুদ্দিন মোল্লার অভিযোগ, ফিরোজ তাদের ৪৫ শতাংশ জমি দখল করে রেখেছেন। এর প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও লিখিত অভিযোগ করে প্রতিকার পাননি।
সরকারি চাকরির প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকে নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে ফিরোজ একই জায়গায় নির্বিবাদে চাকরি করে যাচ্ছেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালে দোহারে বদলি করা হলেও তদবিরের মাধ্যমে সেই আদেশ তিনি বাতিল করান।
অভিযোগকারী জানান, ‘প্রতাপশালী’ এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের মার্চে প্রথমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে তখন তা আমলে নেওয়া হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর অভিযোগকারী আইনজীবী তখনকার জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদের কাছে আবার লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)-কে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিয়া সুলতানার নেতৃত্বে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। তদন্তের অংশ হিসেবে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। তবে কমিটি গঠনের সাত মাস পার হলেও কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
এ ব্যাপারে অভিযোগকারী আইনজীবী চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল দুদক এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দুটি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ এপ্রিল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার পিযুষ কুমার চৌধুরী জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানাতে বলা হয়।
দুদক সূত্র জানায়, বর্তমানে দুদক নেতৃত্বশূন্য রয়েছে। কমিশন পুনর্গঠনের পর বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে ৫ জুলাই বিকেলে মো. ফিরোজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। অন্যদিকে, তদন্তের অগ্রগতি জানতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিয়া সুলতানার মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনিও রিসিভ করেননি।