ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

অদৃশ্য সম্পদের দৃশ্যমান সংকট  

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ এএম

ভূগর্ভস্থ পানি মানব সভ্যতার নিঃশব্দ জীবনরেখা। মাটির নিচের এই অদৃশ্য পানির  ভা-ার ও সামগ্রিকভাবে পানি সম্পদের গুরুত্ব কত অসীম এর  সাক্ষ্য মিলে জীবনযাপনের স্তরে স্তরে ও বিশ্বের খ্যাতিমান পানিবিজ্ঞানী, চিন্তাবিদদের সতর্কবার্তায়। ফরাসি সমুদ্রবিজ্ঞানী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও নৌ-কর্মকর্তা জ্যাক ইভেস কুস্তো বলেছেন, ‘আমরা ভুলে যাই যে, পানির চক্র এবং জীবনের চক্র একই’। আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক, পানিবিজ্ঞানী, আবহাওয়াবিদ লুনা লিওপোল্ড বলেছেন, ‘পানি হলো আমাদের সময়ের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সম্পদ। একটি সভ্যতার সুস্থতা বিচারের মূল মাপকাঠি হলো তাদের পানির স্বাস্থ্য’। ১৮ জুলাই ‘ভরা বর্ষা, শূন্য নলকূপ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে চট্টগ্রামের শিল্প ও কৃষিসমৃদ্ধ দুই উপজেলা আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর ভূগর্ভস্থ পানি সংকটের যে চিত্র উঠে এসেছে তা এই উক্তিগুলোকে আরও গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। অদৃশ্য সম্পদের দৃশ্যমান বিরূপ প্রভাব কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি এরও উদ্বেগজনক বার্তা।

বলা হয়েছে কর্ণফুলী টানেল খুলে দিয়েছে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত, গতি বেড়েছে শিল্পায়নের। কিন্তু এই ঝকঝকে অগ্রগতির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সংকট। এর সঙ্গে প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে নেমে যাচ্ছে মাটির নিচের পানির স্তর। সংকট এখন এতটাই তীব্র যে, ভরা বর্ষাতেও শত শত নলকূপে মিলছে না এক ফোঁটা পানি! সুপেয় পানির জন্য ঘরের দোরগোড়ায় চলছে হাহাকার। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনের এ বার্তা শুধু পানির অভাবই নয়, উপরন্তু ওই এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের চরম অশনি সংকেতও বটে। আমরা জানি, মানব সভ্যতার নিঃশব্দ জীবনরেখা হলো ভূগর্ভস্থ পানি। সেচ-গৃহস্থালি কাজ ও শিল্প ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষায়, গুণাগুণ বজায় রাখতে এবং ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণে প্রয়োজন সুষ্ঠু ও উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বারবার জোর দেওয়া হচ্ছে। মাটির নিচ থেকে মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের মাধ্যমে খনির মতো ব্যবহার করা হলে তাতে টান পড়তে বাধ্য, কারণ তা অফুরন্ত নয়। পানির গুরুত্ব, বিশেষ করে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় এখনই সচেতন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। বিশ্বের অনেক দেশই পানি ব্যবস্থাপনায় নজর গভীর করে সেই নিরিখেই কাজ করে যাচ্ছে।

আমরা জানি, প্রতি বছর ২২ মার্চ ‘বিশ্ব জল দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনটি বিশ্বব্যাপী জল বা পানি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য নির্ধারিত। পানির গুরুত্ব পৃথিবীজুড়ে অত্যন্ত বিশাল এবং তা শুধু জীবনধারণের জন্যই অপরিহার্য নয়, বরং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্যও অপরিহার্য। যথাযথ ব্যবহারের অভাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীজুড়ে পানির সুষম বণ্টনের অভাব এবং দূষণের সমস্যা ক্রমবর্ধমান। এক সমীক্ষায় জানা গেছে, সারা পৃথিবীতে প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে, আর পানি না পাওয়া শুধু জনস্বাস্থ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং এটি কৃষি-শিল্প এবং পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষিত হওয়ার পথ রুদ্ধ করতে না পারলে আগামীতে সংকট আরও প্রকট হবে, এ আশঙ্কা অমূলক নয়। এই প্রেক্ষাপটে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে করণীয় সব কিছু করতে হবে মানুষের কল্যাণের স্বার্থ ও জরুরি প্রয়োজনে।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ-সংরক্ষণ করে তা ব্যবহারে মনোযোগ বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে গৃহস্থালির কাজে তা পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তাছাড়া  পানিশক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারের অঙ্গীকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস করতেও হতে পারে সহায়ক। আমরা মনে করি, বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলোকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নদ-নদীর পানি শোধন করে ব্যবহারে উৎসাহিত করা জরুরি। কারখানার ভেতরে জলাধার তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। পানির পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াও জোরদার করা চাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত