মাত্র ছয় মাস আগে ফাহিমা আক্তারকে (১৯) বিয়ে করেন আনোয়ার হোসেন শাহীন (২৫)। বিয়ের পর ফাহিমা নিজ বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। আর আনোয়ার রাজধানীর ভাটারার নতুন বাজার ১০০ ফিট এলাকায় একটি কাপড়ের শোরুমে চাকরি করতেন। ঢাকায় বাসা ঠিক করে স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন, এমন আশ্বাস দিয়ে রেখেছিলেন ফাহিমাকে। অবশেষে ১০০ ফিট এলাকায় ‘সাজের মায়া’ নামে একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। চলতি মাসের ১ তারিখে স্ত্রীকে নিয়ে সেই বাসায় ওঠেন। তাদের সঙ্গে থাকত ফাহিমার ভাগ্নি হাফসা আক্তার (৮)। বিয়ের বয়স ছয় মাস হলেও তাদের সংসার শুরুর বয়স মাত্র কয়েকদিনের। সংসার শুরুর মাস না পেরোতেই গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন আনোয়ার ও ভাগ্নি হাফসা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ফাহিমা। দুজনকে হারিয়ে বাক্রুদ্ধ আনোয়ার, ফাহিমা ও হাফসার পরিবারে।
গত মঙ্গলবার ভোরে ভাটারা নতুন বাজার ১০০ ফিট এলাকার ওই বাড়িতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে এ ঘটনায় ঘটে। সেদিনই তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার সকালে মারা যায় শিশু হাফসা। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান আনোয়ার। গ্যাস লিকেজের এ ঘটনায় নিহতের পরিবার বাড়িওয়ালাকে দোষারোপ করলেও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও ভয় পাচ্ছে পরিবারটি। জানা গেছে, নিহত আনোয়ার, হাফসা ও চিকিৎসাধীন থাকা ফাহিমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা দেবিদ্বার।
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন শাওন বিন রহমান বলেন, হাফসার শরীরের ৪০ শতাংশ আর আনোয়ারের শরীরের ৫০ শতাংশ পুড়েছিল। ফাহিমা আক্তারের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাকে সারিয়ে তুলতে আমরা অপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
ফাহিমার চাচি শামীমা সুমি জানান, বাড়িওয়ালা একটি ডাবল গ্যাসের চুলার মাঝখান দিয়ে তিন ইঞ্জি পরিমাণ দেওয়াল তুলেছেন। এভাবে ডাবল চুলা সিঙ্গেল করে দুই পরিবারকে দিয়েছেন। এতে পাশের ভাড়াটিয়ারা চুলা চালু করলে ফাহিমাদের পাশে শোঁ শোঁ শব্দ হতো। গ্যাসের গন্ধ বের হতো। লাইন থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরত। বিষয়টি বাড়িওয়ালা জানানোর পর পাইপ মেরামত করে দেন। এরপর কয়েকবার এরকম পাইপ লিক হয়। পরে বাড়িওয়ালা আর পাইপ ঠিক করে দেননি। এতে লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ফাহিমা রাত ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে। এরপর ফ্লোরে শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর শোঁ শোঁ শব্দ শুনে রান্না ঘরের দিক এগিয়ে যায়। এর মধ্যেই আগুন ধরে যায়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সবার গায়ে ধরে যায়। তিনজনই বিবস্ত্র হয়ে যায়। আশপাশের লোকজন কোনোরকমে একটি ছেঁড়া কাপড় দিয়ে ফাহিমাকে ডেকে উদ্ধার করে। পরে তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করায়। তার অভিযোগ, গ্যাস লাইন লিকেজের পেছনে বাড়িওয়ালার গাফিলতি ছিল। ঘটনার পর তিনি হাসপাতালে মাত্র একদিন দেখতে গিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু ফাহিমার পরিবার খুবই দুর্বল প্রকৃতির। তারা আইন-আদালতের বিষয়ে ভয় পান।
মাদ্রাসায় আর যাওয়া হলো না হাফসার : পারিবারিক ঝামেলার কারণে ছোটবেলা থেকেই খালা ফাহিমার কাছে থাকত শিশু হাফসা। বিয়ের পরও হাফসাকে সঙ্গে রাখতেন ফাহিমা। তাই তার সঙ্গেই হাফসাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঘটনার আগের দিন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় হাফসাকে ভর্তি করানো হয়। পরের দিন তার মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরদিন সূর্য উদিত হওয়ার আগেই নিভে যায় হাফসার জীবন-প্রদীপ।
ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালে এসে মেয়ের জন্য অজোরে কেঁদেই যাচ্ছিলেন মা রাহিমা বেগম। মেয়ে সুস্থ হয়ে তাদের মাঝে ফিরে আসবে কি না, সেই আশঙ্কায় ছিলেন। অবশেষে রাহিমার সেই আশঙ্কায়ই সত্যি হলো। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ফাহিমাকে নিয়েও একই আশঙ্কা পরিবারের।
ভাটারা থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় নিহত হাফসার মা রাহিমা বেগম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। তবে তারা বাড়িওয়ালার গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন, তাই অবহেলাজনিত মৃত্যুর ধারায় এই মামলা না নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা কেন, এর উত্তরে ওসি বলেন, তারা তো এমন অভিযোগ করেননি। তারা অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করলে আমরা অবশ্যই নিতাম।