উচ্চঝুঁকির পরও অবাধে ব্যবহার ১৭ বালাইনাশক

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৮ এএম

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিলসহ বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এই আগাছানাশকটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে বাংলাদেশে এখনো কৃষিতে এর ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। শুধু প্যারাকোয়াট নয়, দেশে এ ধরনের উচ্চঝুঁকির ১৭টি বালাইনাশক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, অসংক্রামক রোগ বাসা বাঁধছে মানুষের শরীরে।

সম্প্রতি বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯০তম (বিশেষ) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বালাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে আরও ১৭টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশকের ব্যবহার থেমে নেই। এসব বালাইনাশক ১ হাজার ৭৪১টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত এবং বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, বিপজ্জনক বালাইনাশকগুলোর তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাজার থেকে প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে কখন কীভাবে এ কাজ করা হবে তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম দেশ রূপান্তরকে জানান, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে ৬৫-৭৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগে। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে, পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশু।’

পিটাক সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, বালাইনাশকের বাজারে প্রভাবশালী অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা চায় না ক্ষতিকর বালাইনাশক বন্ধের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসুক। এজন্য চাইলেও কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত এই উপদেষ্টা কমিটি গ্রহণ করতে পারছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের চাপে অনেক বিষয়ে পিটাকে কোনো আলোচনাই হয় না। আবার কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরবর্তী সময় বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো চাপের কারণে পিটাক সভা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং বালাইনাশকের নিবন্ধন দিয়ে থাকে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে এই বিভাগ প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট নামের দুটি বালাইনাশকের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পুনঃনিবন্ধন এবং নতুন নিবন্ধন বন্ধ রেখেছে। যাদের ব্র্যান্ডের নিবন্ধনের মেয়াদ রয়েছে তারা এখনো বাজারে পণ্য বিক্রি করছে। এর বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ আরও ১৫টি বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত এখনো গ্রহণ করা হয়নি।

বাংলাদেশে ১৯৫০ এর দশকে কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে ৩ মেট্রিক টন কীটনাশক আমদানি করা হয়েছিল, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ৪০ হাজার টন ছাড়িয়েছে। সরকার বালাইনাশক আমদানিতে ব্যাপক ছাড় দেওয়ায় বর্তমানে দেশে ৩২৭টি মলিকুল বা ভ্যারিয়েন্টের পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। ৭ হাজার ৪০৫টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত এসব বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে কৃষিতে।

আমদানি করা বালাইনাশক বন্দরে পরীক্ষা : পরীক্ষা করে দেখা গেছে বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠানের বালাইনাশকে মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়। এসব বালাইনাশক মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষিত করতে ভূমিকা রাখছে। ফলে বিভিন্ন গবেষণায় কৃষিপণ্য এবং মানুষের শরীরে সীসাসহ নানা ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতিও শনাক্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে মানবদেহে অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে।

বালাইনাশক পরীক্ষা করার পর নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ কৃষি মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দরে চিঠি দিয়ে আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপের নির্দেশনা দেয়। তবে সে সময় ব্যবসায়ীদের চাপে তখনকার কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বিষয়টি ছয় মাস স্থগিতের সুপারিশ করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়, পিটাক বা কৃষি বিভাগ কেউই আর উদ্যোগ নেয়নি।

তবে প্রায় ছয় বছর পর ৯০তম পিটাক সভায় বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘আমদানি করো বালাইনাশক দেশে ঢোকার আগে বন্দরে গুণগত মান পরীক্ষা এবং এতে কোনো ভেজাল বা ক্ষতিকারক ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ আছে কি না তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।’ অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে, এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপযোগী ল্যাবরেটরি বা অবকাঠামো এখনো তৈরি করা হয়নি।

সভায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবে ফল, সবজি, পান, শুঁটকি মাছসহ বিভিন্ন পণ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের জন্য রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে সবজির প্রায় ১০ শতাংশ, ফলের ৪ শতাংশ এবং পান ও শুঁটকি মাছে বিপজ্জনক মাত্রায় অবশিষ্টাংশ রয়েছে।’

ল্যাবের প্রয়োজনীয় সক্ষমতার অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৩২৭টি কেমিক্যাল পেস্টিসাইড মলিকুল থাকলেও তাদের ল্যাবে ৭০টির বেশি পরীক্ষার সক্ষমতা নেই। এজন্য কারিগরি দক্ষ জনবল ও আর্থিক বরাদ্দের প্রয়োজন।’

সভায় বিসিপিএ-এর সভাপতি এম সাইদুজ্জামান অবশ্য কৃষিপ্রধান কয়েকটি দেশ এখনো প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরেন। অথচ ৭৩তম বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সভায় এই দুটি বালাইনাশকের নতুন করে নিবন্ধন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। এই সভায় আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী বিধিমালা তৈরি, সমস্যা সমাধানে নিয়মিত পিটাক সভার আয়োজন, বিপজ্জনক বালাইনাশক বাজার থেকে প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, বন্দরে বালাইনাশক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা করে ভারী ধাতু দূষণের উৎস খুঁজে দেখার মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত