ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন শীর্ষ মার্কিন জেনারেল

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র, এমন বার্তাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তাঁর আশঙ্কা, যুদ্ধ আরও বাড়ানোর জন্য যেসব সামরিক বিকল্প সামনে রয়েছে, সেগুলো উল্টো ফল দিতে পারে। একই সঙ্গে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করাও সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। শনিবার (৮ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন সূত্রের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।   

একটি সূত্রের ভাষায়, 'কেইন সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।' সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিকভাবে আরও উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে কেইন নিজেও উদ্বিগ্ন। তিনি সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে কেইন এসব কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগে সামরিক বিকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সবাইকে একই অবস্থানে আনা।

সূত্রগুলো বলছে, ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়ে ট্রাম্প শুরু থেকেই অনাগ্রহী। তাঁর ধারণা, ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে তেহরানকে তাঁর শর্তে একটি চুক্তিতে রাজি করানো সম্ভব। তবে কেইনসহ প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে এমন ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্পের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই অন্য সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প খোঁজা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস অবশ্য কেইনের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা দলে জেনারেল কেইন 'অসাধারণ সম্পদ' এবং সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের সাফল্যই তাঁর ভূমিকার প্রমাণ।

তবে কেইনের নিজস্ব মূল্যায়ন আরও সতর্ক। গত মাসের শেষ দিকে কংগ্রেসে এক শুনানিতে তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, 'বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।' যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, সামরিক বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে, একই অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে।

এ কারণেই জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে আরও বড় ও আগ্রাসী হামলার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কেইন ও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, নতুন করে হামলা চালালে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও ট্রাম্প শুরুতে ওই 'ব্যাপক' অভিযানে সম্মতি দেওয়ার দিকে এগিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি তা থেকে সরে আসেন। তবে ভবিষ্যতে ওই হামলার পরিকল্পনা আবার বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রশাসনের একটি সূত্র।
 
এ সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সিএনএন এর আগে জানিয়েছে, দীর্ঘ সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের হামলা ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে না দাঁড় করিয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ করতে পারে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

কেইন অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়েও সতর্ক। সামরিক পরিকল্পনার সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো প্রেসিডেন্টের সামনে তুলে ধরলেও তিনি তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং একপর্যায়ে হোয়াইট হাউসে একটি অফিস পাওয়ারও চেষ্টা করেন, যাতে নিয়মিত প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করা এবং নিরাপদ পরিবেশে কাজ করা সম্ভব হয়।

গত মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকেও কেইন ইরানে আরও হামলা চালানোর সম্ভাব্য ঝুঁকি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুত নিয়ে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্টকে এটিও জানান, ট্রাম্প যদি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।

তবে ব্যক্তিগত আলোচনায় কেইন আরও সরাসরি বলেছেন, এই পর্যায়ে শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম। একজন সূত্রের ভাষায়, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় কেইন অনেক সময় নিজের অবস্থান পুরোপুরি কঠোরভাবে তুলে ধরেন না। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার দীর্ঘমেয়াদি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি আগের চেয়ে বেশি সরব হয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত