শিক্ষার আলোয় ফিরতেই উচ্ছেদের শঙ্কা!

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকায় আরডিএ পার্কের বিপরীতে রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোনো বিদ্যালয় ছিল না। জীবিকার তাগিদে যেখানে শিশুদের অনেকেই অল্প বয়সেই ভাঙারি সংগ্রহ, গৃহস্থালির কাজ কিংবা অন্য অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হয়ে পড়ত, সেখানে ‘বিকল্প পাঠশালা’ তাদের জীবনে নতুন করে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শিক্ষার এই নতুন পথচলাতেই এখন দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দিয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। এতে একদিকে বসতি হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে শিশুদের এই বিকল্প পাঠশালার।

ঘিঞ্জি বসতি, অভাব-অনটন আর জীবনসংগ্রামের মধ্যেই বসবাস করেন এখানকার মানুষ। কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, আবার কেউ শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাঙারি সংগ্রহ করে সংসার চালান। স্থানীয়দের দাবি, এই বস্তিতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবারের বসবাস। কেউ কেউ জানান, তারা তিন-চার দশক ধরে এই এলাকায় বসবাস করছেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও তাদের সন্তানদের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা।

এমন বাস্তবতায় ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’র উদ্যোগে বস্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বিকল্প পাঠশালা’। মাত্র ১০০ স্কয়ার ফিটের এই স্কুলে বর্তমানে প্রায় ৪৫-৫০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রাজশাহী কলেজের প্রায় ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থী বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের পাঠদান করছেন। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সপ্তাহে ছয় দিন চলে ক্লাস। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ দেওয়া হচ্ছে। যোগ-বিয়োগ, বানান, হাতের লেখা, ড্রয়িংসহ প্রাথমিক শিক্ষার নানা বিষয় শেখানো হচ্ছে শিশুদের।

শুধু শিশুদের জন্য নয়, প্রতি শুক্রবার বস্তিতে বসবাসকারী বয়স্কদের জন্যও চালু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশার জায়গা।

বিকল্প পাঠশালার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জেসমিনের কথায় উঠে এসেছে সেই পরিবর্তনের ছবি। সে বলে, ‘আমাগো এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিলো না। এখন ভার্সিটির ভাইয়েরা আমাদের নিয়মিত পড়াশোনা করান। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা স্কুলে আসি এবং ভাইয়েরা খুব ভালো পড়ায়।’

শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুলের কাছেও স্কুলটি এখন আনন্দের জায়গা। তার ভাষায়, ‘শনিবার সকালে শেখায়। এছাড়া প্রতিদিন বিকেলে ক্লাস হয় আমাদের। অনেক কিছু শেখায়। যোগ, বিয়োগ, ড্রয়িং এবং বানান সবকিছুই এই স্কুল থেকে শেখানো হচ্ছে।’

শিশুদের এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন নিয়মিত এই স্কুলে ক্লাস নেন। তিনি বলেন, ‘এই এলাকাটি খুবই অবহেলিত। পাশের পদ্মা আবাসিক এলাকার অনেক বাসায় এখানকার মানুষ কাজ করেন। কেউ গৃহকর্মী, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন। তাদের শ্রমেই অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবন চলে। অথচ তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন জানতে পারি অবহেলিত এসব শিশুদের নিয়ে একটি কর্মসূচি শুরু হয়েছে, তখন থেকেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। নিজের সময় অনুযায়ী নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ তারাও আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে সমাজ কখনোই সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবে না।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসানও মনে করেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা সামাজিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘এখানকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে। অল্প বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। কারণ এখানে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই অত্যন্ত দরিদ্র। শুধু বস্তির শিশু বলে তাদের অবহেলা করা হয়। অথচ এসব শিশুও সমাজের অংশ। তারা শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকবে এটা আমরা চাই না।’

স্কুল বদলেছে শিশুদের স্বপ্ন

শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ তৈরি হওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। স্কুল কমিটির উপদেষ্টা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে রাজশাহী রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে থাকা শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানকার অনেক শিশু ১০-১২ বছর বয়সেই কাজে যুক্ত হয়ে যায়। তাদের সেই বাস্তবতা থেকে বের করে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’

তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পর এখানকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা এখন স্বপ্ন দেখছেন, তাদের সন্তানরাও পড়াশোনা শিখবে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যেতে পারবে।’

কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বস্তি উচ্ছেদের আশঙ্কা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দিয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। ফলে বসবাসের জায়গা হারানোর পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতাও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি এই বস্তি উচ্ছেদ করে, তাহলে এখানকার মানুষ কোথায় গিয়ে উঠবে? তাদের সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করবে? উচ্ছেদের আগে অবশ্যই তাদের সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আমরা চাই, মানুষগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পরই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এত বড় একটি বস্তিতে আগে কোনো স্কুল ছিল না। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিনামূল্যে এসব শিশুকে পড়াচ্ছেন। এই উদ্যোগটি চালু রাখা গেলে বহু শিশুর জীবন বদলে যেতে পারে।’

‘স্কুলটা আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে’

বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী রোজিনা বেগম বলেন, ‘আমাদের এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মামারা একটা স্কুল চালু করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছে। আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। কিন্তু এখন শুনছি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাহলে আমরা কোথায় যাব, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনাই বা কোথায় হবে?’

আরেক বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ। নিজেরাই ভালো করে খেতে পারি না, সেখানে সন্তানদের পড়াশোনা করাব কীভাবে? এই স্কুল আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। ৩০-৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এতদিন এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করছে। এখন যদি বস্তি ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? আর আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা হবে কোথায়?’

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বস্তিতে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই নিম্ন আয়ের। তাদের জীবিকার ধরনও অনিশ্চিত। ফলে সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানো, বই-খাতা কেনা কিংবা স্কুলের অন্যান্য খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন। অনেক পরিবারে শিশুরাও পরিবারের আয়-রোজগারে সহযোগিতা করে। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বদলে জীবিকার তাগিদই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়।

রাজশাহী মহানগর বিপ্লবী দলের সদস্য সচিব মো. ফয়সাল শেখ বলেন, ‘এই বস্তিতে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস। এখানে প্রায় ৫০-৬০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। এসব শিশু সমাজে অনেকটাই অবহেলিত। তাদের মা-বাবা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, ভিক্ষা করেন কিংবা ভাঙারি সংগ্রহ করে জীবন চালান। মানবেতর জীবনযাপন করা এসব পরিবারের সন্তানদের ভালো জায়গায় পড়াশোনা করানো অত্যন্ত কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘এমন একটি এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এনজিও সংস্থা যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা যে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় ‘সম্পর্ক’

সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি গোপালদেব শর্মা জানান, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে তাদের সংগঠন। সেই ধারাবাহিকতায় ভদ্রা রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করি। এই বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই স্কুলটি নির্মাণ করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪৫-৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে। তাদের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হচ্ছে।’

গোপালদেব শর্মা আরও বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস নেন। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার ছয় দিন ক্লাস পরিচালিত হয়। পাশাপাশি শুক্রবার বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ফলে বস্তিতে বসবাসকারী বয়স্ক ব্যক্তিরাও শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘এখানকার অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র। কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, আবার কেউ ভাঙারি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেক পরিবারই ঠিকমতো সন্তানদের খাবার দিতে পারে না। সেখানে পড়াশোনার খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন। তাই সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে সামর্থ্যবান প্রত্যেকেরই এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

শুধু শিক্ষা নয়, বস্তিবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বস্তিতে কয়েক দশক পর শিক্ষার আলো জ্বালানো হয়েছে, উচ্ছেদের পর সেই আলো কোথায় গিয়ে জ্বলবে? শিশুদের পড়াশোনা, তাদের নতুন করে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং স্বেচ্ছাসেবীদের এই উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে হলে বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করাকেই জরুরি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত