বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এই মাধ্যমে লেনদেনে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি বা সেবা মাশুল দিতে হবে না। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা মার্চেন্ট ছাড়ের হার (এমডিআর) কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার (১০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের জারি করা এক সার্কুলারে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, যা আগামী ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক সব লেনদেনে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান পুনঃপরিশোধ ফি (আইআরএফ) শূন্য হবে। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করবে, তাকে গ্রাহকের অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে এ বাবদ কোনো ফি দিতে হবে না। এর মাধ্যমে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট সার্কুলারের বাংলা কিউআর লেনদেনসংক্রান্ত নির্দেশনা সংশোধন করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১ জুলাই জারি করা এ-সংক্রান্ত আরেকটি নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মার্চেন্ট পেমেন্ট সহজ করা এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে বাংলা কিউআর চালু করা হয়। এর আওতায় ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মালিকানাধীন কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রায় ২৪ লাখ ব্যবসায়ী বাংলা কিউআরে যুক্ত হয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বাড়লেও এই মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ আশানুরূপ বাড়েনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় এর অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত মার্চেন্ট ছাড়ের হার বা এমডিআরকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলা কিউআর লেনদেনে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এমডিআর নেওয়া হতো। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান পুনঃপরিশোধ ফি হিসেবে দিতে হতো। ফলে গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এমডিআর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো কঠিন ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, আইআরএফ শূন্য করার ফলে এখন গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে এমডিআর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে। আর এমডিআর কমলে কম মুনাফায় ব্যবসা করা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরাও নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহী হবেন।
শুধু ফি কমানো নয়, বাংলা কিউআর ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলও গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এ তহবিলের অর্থ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত খুচরা হিসাবের মাধ্যমে যুক্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারীদের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর দিয়ে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় পেমেন্ট সুইচ (এনপিএসবি) লেনদেনে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের পরিমাণের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ এবং অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হবে।
তবে প্রণোদনা পাওয়ার জন্য কোনো লেনদেনকে ভেঙে একাধিক ছোট লেনদেন দেখানো যাবে না। কৃত্রিমভাবে লেনদেন বাড়ানো বা অন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করলেও প্রণোদনা মিলবে না। ব্যর্থ, বাতিল, ফেরত, অর্থ ফেরত নেওয়া, বিরোধপূর্ণ বা পরবর্তী সময়ে বাতিল হওয়া লেনদেনের ক্ষেত্রেও প্রণোদনা দেওয়া হবে না।
কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিক সংখ্যক বা অস্বাভাবিক ধরনের লেনদেন হলে সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে তা পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করতে হবে। লেনদেন কৃত্রিমভাবে ভাগ করা, নগদ উত্তোলন বা অন্য কোনো অপব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দায়ী থাকবে। ভুল বা অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা ফেরত নিতে বা পরবর্তী প্রণোদনার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পারস্পরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই বাংলা কিউআর চালু করা হয়েছে। আইআরএফ শূন্য করা এবং প্রণোদনা দেওয়ার ফলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমার পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের পরিধিও বাড়বে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে নগদনির্ভর লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
