ঋণের নামে লোপাট ১২০ কোটি টাকা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

ব্যাংকের ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ সহায়ক জামানত নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই নিয়ম মানা হয়নি আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটিকে মাত্র ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ সহায়ক জামানতের বিপরীতে ৬২ কোটি ১৪ লাখ ২১ হাজার ৯৪৬ টাকা ঋণ দেয় বেসিক ব্যাংক। পরে সুদ-আসলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ কোটি ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকার বেশি। পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় ঋণের বড় অংশই আর আদায় করা সম্ভব নয়। এদিকে, বেসিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রাখা সম্পদ নিলামে বিক্রির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। মামলা নিষ্পত্তির পর এই সম্পদ বিক্রি করে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হলেও বাকি প্রায় ১১০ কোটি টাকা আদায় করা যাবে না।

সরকারি এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের যোগসাজশ, ঋণ নীতিমালা লঙ্ঘন, সম্পদের অতি মূল্যায়ন এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের কারণে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ আদায়-অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানা নীলফামারি জেলায়। ঢাকার বনানীতে প্রতিষ্ঠানের করপোরেট অফিস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মারুফ জামান এবং চেয়ারম্যান সাহেরা বানু। ২০১২ সালে বেসিক ব্যাংক পিএলসির প্রধান শাখায় আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পক্ষে ঋণ আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মেয়াদি ঋণ, ৯ কোটি টাকা ক্যাশ ক্রেডিট (হাইপোথিকেশন) এবং পরে আরও ১৬ কোটি ৭৫ লাখ ২১ হাজার ৯৪৬ টাকা টার্ম লোন অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ নীতিমালায় ১০০ শতাংশ সহায়ক জামানত নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। এমনকি ঋণ অনুমোদনের শর্তেও পর্যাপ্ত সহায়ক জামানত গ্রহণের কথা উল্লেখ ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগসাজশ করে সেই শর্ত উপেক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করেন। ঋণ বিতরণের পর গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেননি। ফলে ঋণটি ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হয়।

পুনঃতফসিলেও মানা হয়নি শর্ত : ২০১৮ সালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়। পুনঃতফসিলের শর্ত অনুযায়ী ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ সহায়ক জামানত নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এর ২০১৮ সালে ৩৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৫০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ১০০ শতাংশ জামানত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া পুনঃতফসিল অনুমোদনের এক মাসের মধ্যে জামানতের পুনর্মূল্যায়ন করে রিকভারি বিভাগকে জানানো বাধ্যতামূলক থাকলেও শাখা কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনাও অনুসরণ করেনি। ফলে ঋণের নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আদায়-ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

৬২ কোটি টাকার ঋণে জামানত ছিল মাত্র ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা : ২০২০ সালে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাংকের রিকভারি বিভাগ জামানতের মূল্য নির্ধারণে এসআইআইএস কনসাল্টিং কোম্পানিকে নিয়োগ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে দেখা যায়, ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা ১৫৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ ঋণ বিতরণের সময় ওই সম্পদের মূল্য ছিল মাত্র ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ, প্রায় ৬২ কোটি ১৪ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে গ্রহণ করা হয়েছিল মাত্র ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪ হাজার টাকার সহায়ক জামানত, যা মোট ঋণের মাত্র ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জেনেশুনেই এত কম মূল্যের জামানত গ্রহণ করে ঋণ বিতরণ করেন, যা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সুদে-আসলে ঋণ দাঁড়ায় ১২০ কোটি টাকা : আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ঋণ গ্রহণের পর ঠিকমতো কিস্তি পরিশোধ না করায় ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে সুদ-আসলে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১২ কোটি ৪২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭ টাকা। তখন ঋণের বিপরীতে বিদ্যমান জামানতের মূল্য ছিল মাত্র ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা মোট পাওনার মাত্র ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাওনা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করার পাশাপাশি বন্ধকী জমি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেয়। নিলাম আহ্বানের আগে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদসহ গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ১২০ কোটি ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার ২৬৯ টাকা। কিন্তু পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় এই অর্থ আদায়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংককে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে।

নিলামে সম্পদ বিক্রি হয়নি : বেসিক ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে খেলাপি গ্রাহক ঘোষণা করে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। মামলার আগে নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংক বন্ধকী জমি নিলামে বিক্রি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। এ জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি নিলাম আহ্বান করে। কাগজপত্রে ১৫৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির কথা বলা হলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিলামে ১৩৪৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি বিক্রির তথ্য উল্লেখ করে। কিন্তু ওই নিলামে আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বন্ধকী জমি ক্রয়ের জন্য কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত সম্পদ বিক্রি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলমান। জানা গেছে, গ্রাহকের বন্ধকী সম্পদ নিলামে বিক্রি করে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হলেও বাকি প্রায় ১১০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে না। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কার্যত অনাদায়ী থেকে যাবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুদক ৫৬টি মামলা করেছে। এর মধ্যে আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধেও একটি মামলা হয়েছে। দুদকের মামলায় এই ঋণ প্রদানের ঘটনায় কী কী অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। দুদক মূলত ক্রিমিনাল মামলা করেছে। আর ব্যাংক করে রিকভারি মামলা, যেটিকে মূলত সিভিল মামলা বলা হয়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঋণ অনুমোদন, সহায়ক জামানত গ্রহণ, পুনঃতফসিলীকরণ এবং পরবর্তী তদারকির প্রতিটি পর্যায়েই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণ নীতিমালা উপেক্ষা করে ঋণ বিতরণ, দুর্বল জামানত ব্যবস্থাপনা, পুনঃতফসিলের শর্ত বাস্তবায়নে শিথিলতা এবং জবাবদিহির অভাব। আজবিহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ঘটনাটি সেই দীর্ঘদিনের অনিয়মের একটি প্রকট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত