বাবার ঘামের সম্মান

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার সন্ধানে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মো. মেরাজুল আলী। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি, মানুষের বোঝা আর যাত্রী টেনে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার সংসার। নিজের জীবনে কষ্টের শেষ না থাকলেও, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচে কখনো কার্পণ্য করেনি এই সংগ্রামী বাবা। তার বুকে একটাই স্বপ্ন সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। বাবার সেই ত্যাগের মূল্য আর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে ছোট ছেলে মো. সাহাদৎ হোসেন।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে ১ হাজার ১৬৭ নম্বর পেয়ে সে অভাবনীয় কৃতিত্ব অর্জন করেছে। বিদ্যালয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মানবিক বিভাগে সাহাদতের এই ফলাফল পুরো উপজেলায় অন্যতম সেরা এবং সে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। অভাবের সংসারে বাবার ঘামে ভেজা উপার্জনকে সার্থক করে সাহাদৎ প্রমাণ করেছে ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো বাধাই জয় করা সম্ভব।

মো. মেরাজুল আলীর বড় ছেলে বর্তমানে গোপালগঞ্জের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। আর ছোট ছেলে সাহাদৎও এবার নিজের মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে পরিবারের স্বপ্নে নতুন আলো জ্বালিয়েছে।

সাহাদতের পড়াশোনার পথটাও সহজ ছিল না। দামি কোচিং কিংবা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছিল তার নাগালের বাইরে। তবু নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করেই এগিয়েছে সে। সাহাদৎ জানায়, ভবিষ্যতে সে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে চায়। শুধু একটি ভালো চাকরি পাওয়াই তার লক্ষ্য নয়; সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চায় সে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় নিজের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার স্বপ্নও দেখে এই কিশোর। তার ভাষায়, জীবনে বড় হতে হলে অর্থের চেয়ে বেশি প্রয়োজন লক্ষ্য, পরিশ্রম ও মানুষের দোয়া। বাবার কষ্টকে কাছ থেকে দেখেই জীবনের বাস্তবতা শিখেছে সে। তাই ভবিষ্যতে এমন জায়গায় যেতে চায়, যেখান থেকে সাধারণ মানুষের উপকার করা সম্ভব হবে।

ভ্যানচালক বাবার সন্তান সাহাদতের পথ এখনো দীর্ঘ। তবে তার অদম্য ইচ্ছা ও সাফল্য প্রমাণ করেছে স্বপ্নের উচ্চতা দারিদ্র্য দিয়ে মাপা যায় না। দৃঢ় মনোবল আর সুযোগ পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সাধারণ ঘর থেকেও অসাধারণ গল্প তৈরি সম্ভব। সবার দোয়া ও সহযোগিতা নিয়ে সাহাদৎ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, যেন ভবিষ্যতে একজন সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে মানুষের সেবা করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত