গ্যাস সংকট

ভোলার ভুল শুধরানো হোক

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৩ এএম

গ্যাস আমাদের তরল সোনা হিসেবে অভিহিত। ভূগর্ভের এই সম্পদ নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত বহুমুখী বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। যেমনটি ঘটেছে ভোলা ও আশপাশে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা সত্ত্বেও। ১৩ আগস্ট এরই চিত্র উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোলায় নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা মিললেও যথাসময়ে অনুসন্ধান ও উত্তোলন না হওয়ায় তার খেসারত দিচ্ছে দেশ। ভোলার বোরহানউদ্দিনে ১৯৯৫ সালে গ্যাস পাওয়ার পর ৩১ বছর কেটে গেলেও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। এমনকি ভোলার আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও অনুসন্ধান ও উত্তোলনে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেশে গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহকৃত পরিমাণের মধ্যে ব্যবধান অনেক। চাহিদা রয়েছে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট আর সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ভোলায় অন্তত দৈনিক ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত রয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আরও ২০টি কূপ খনন করলে প্রতি কূপে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। সব মিলিয়ে ভোলা থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে সংকট থাকত না, এও বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় যদি দূরদর্শিতার ঘাটতি থাকে, বাস্তবতা অনুধাবনে অক্ষমতা প্রকাশ পায় তাহলে তা দেশ-জাতির জন্য অকল্যাণের পথটাই সুগম করে। গ্যাসের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে।

ভোলার গ্যাস সম্পর্কে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্য, ‘ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকার আশাবাদী।’ ভোলার নর্থ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয় ২০১৮ সালে। সম্প্রতি মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদীতে দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে বাপেক্স তথ্য দিয়েছে, সব মিলিয়ে ৩ হাজার ২২০ কিলোমিটার জরিপের ফল গত মাসে তাদের হাতে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, ভোলা নর্থের সঙ্গে এই এলাকার ভূ-গঠনের মিল রয়েছে, যা গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা। বিদ্যমান গ্যাস সংকট ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’ বহুল শ্রুত এই প্রবাদটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। ভোলার গ্যাস নিয়ে এখন যে চিন্তা করা হচ্ছে, আমরা মনে করি, যথাযথ সমীক্ষা চালিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ণয় করা দরকার। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ভোলা থেকে পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস আনাই হবে উপযুক্ত। ভোলার গ্যাস গ্রিডে আনতে হলে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার ওপর তারাও জোর দিয়েছেন। এর আগে সিএনজি করে আনার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, এও তাদের ভাষ্য। এখন যে পাইপলাইন ও এলএনজি করার কথাও বলা হচ্ছে আমরা মনে করি তাও সমীক্ষার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হোক। কীভাবে ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো যায় এ ব্যাপারেও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়াই শ্রেয় বলে আমরা মনে করি। স্থলভাগ ও সমুদ্রগর্ভে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলোর ব্যাপারেও বাপেক্সকে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্তে উপনীত হাওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।

ভুলের খতিয়ান যাতে আর দীর্ঘ না হয়, মনোযোগ বাড়–ক সেদিকে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প খাতের স্থবিরতা কাটাতে দেশীয় গ্যাস সম্পদের অনুসন্ধানে জোর দেওয়া এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। আমাদের স্মরণে আছে, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও তখন শিল্পের স্বার্থে আবাসিক গ্রাহক ও শিল্প মালিকরা বাড়তি দাম মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাড়তি দামেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস মিলছে না। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ত্রুটিহীন করার বিকল্প নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর অনাবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র থাকলেও অনুসন্ধান কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই, বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্য বাপেক্সকে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত