এখন সিরিজ জয়ের ভাবনা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০ এএম

ডারউইনে ইতিহাস লেখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে জয়ের কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ড থেকে শুভেচ্ছা পাচ্ছেন বলে জানান টিম ম্যানেজার নাফিস ইকবাল। এখন সামনে তাকিয়ে সফরকারীরা। ২২ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্ট জিতলে তো কথায় নেই, এমনকি ড্র করলেও নিজেদের সব অর্জনকে ছাপিয়ে যাবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার সিরিজ জয়ের অবিশ্বাস্য গৌরব অর্জন করবে তারা। পারবেন কি নাজমুল হোসেন শান্তরা? দলের সঙ্গে থাকা প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের মুখে রহস্যের হাসি, ‘দেখাই যাক। এখানে আসার আগে কেউই বা ভেবেছিল, দ্বিতীয় টেস্টের আগে আমাদের সিরিজ জয় নিয়ে আলোচনা হবে।’ ডারউইনে জয়ের উৎসবের ঘোর কাটিয়ে এখন সেদিকেই মনোযোগ বাংলাদেশ দলের।

শান্তদের জন্য যেটি সিরিজ নিশ্চিতের মঞ্চ, প্যাট কামিন্সদের জন্য অন্তত সমতা ফেরানোর শেষ সুযোগ। এই মাঠের জন্যও ম্যাচটি ঐতিহাসিক। অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের এই ম্যাচ দিয়েই প্রথমবারের মতো সেখানে ছেলেদের টেস্ট হবে, যা দেশটির দ্বাদশ টেস্ট ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। এজন্য দুই দলের কাছেই বেশ রহস্যের চাদর বিছিয়ে রেখেছে ম্যাকায়ের হ্যারাপ পার্ক কমপ্লেক্সের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা। যদিও স্বাগতিকরা সেখানে গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি ওয়ানডে খেলেছে। 

আজ ডারউইন থেকে সেখানে যাওয়ার আগে সতর্ক বাংলাদেশ। প্রথম টেস্ট জয়ের পরই অধিনায়ক শান্ত জানান, মাটিতে পা রাখতে চান তারা। ড্রেসিংরুমে ফিরে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধান কোচ ফিল সিমন্সও, ‘আমরা সফলভাবে আমাদের সফরের প্রথম অংশ শেষ করেছি। কারণ আমরা এখানে শুধু একটি টেস্ট ম্যাচ খেলতে আসিনি। এখন একটি শেষ করেছি। সামনে কয়েকটি দিন আছে, এই অনুভূতিটা উপভোগ করতে পারি।’ উদযাপনের রাশ টেনে ধরে এই ক্যারিবীয় বলেন, ‘সাফল্য এবং ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আজ আবেগ অনেক ওপরে উঠবে। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, এটাকে খুব বেশি ওপরে উঠতে দেওয়া যাবে না। কারণ সিরিজ জিততে গেলে আমাদের এখনো একটি ম্যাচে লড়াই করতে হবে।’

অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারানোর অভিজ্ঞতা সিমন্সের নতুন নয়, খেলোয়াড় হিসেবে এই স্বাদ পেয়েছেন তিনি। তবু এই জয়টা তার কাছে আলাদা, ‘আমি এই অনুভূতি অনেকবার পেয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই এটা একই রকম থাকে, জেতার অনুভূতি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর অনুভূতি সহজে আসে না। আমি অনেকবার পেয়েছি, কিন্তু আজ আমি জানি এই মুহূর্তে আমার কেমন লাগছে। আমি খুব বেশি আবেগে ভাসতে চাই না, কিন্তু এই মুহূর্তে এটা কোচ হিসেবে আমার পাওয়া সবচেয়ে বড় জয়গুলোর একটি।’ দলের অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের নাম ধরে সিমন্স বলেন, ‘খালেদ, টিজে (তাইজুল) অনেক দিন ধরে আছে। অমিত, শরিফুল, সাদমান, হাসান, এবাদত, তামিম আমাদের সঙ্গে আছে। এখন হয়তো তোমরা সবাই গুরুত্বটা উপলব্ধি করতে পারছ না। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ফিরে তাকালে বুঝবে, এটা তোমাদের ক্যারিয়ারে অর্জন করা সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি।’

মাঠের পারফরম্যান্সের গল্প কম রোমাঞ্চকর নয়। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে খেলার নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ। পরে ২২৮ রানের লিড নেয় তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে থামিয়ে ৫৭ রানের লক্ষ্য টপকায় ৯ উইকেট হাতে রেখে। ব্যাট-বল দুই বিভাগেই আলো ছড়ানো মেহেদী হাসান মিরাজ আইসিসিকে বলেন, ‘অবশ্যই আমরা সেভাবেই (সিরিজ জয়) ভাবছি এবং আমরা যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছি, সেটিতেই মনোযোগ ধরে রাখতে চাই।’ তবে তার কথায়ও সতর্কতা স্পষ্ট, ‘যেহেতু আমরা প্রথম ম্যাচ জিতেছি, এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে টেস্ট ম্যাচ জেতা কখনোই সহজ নয়। এ মুহূর্তে আমরা শুধু ধারাটা ধরে রাখতে চাই, আর পরের ম্যাচ নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করব পরে।’

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের চেনা পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা। মাঠটিকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে কুইন্সল্যান্ড সরকার বিনিয়োগ করেছে ২০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি। তবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় অজানা প্রশ্ন উইকেট। ছেলেদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে ২০২৫ সালের দুই ওয়ানডেতে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। একবার ১৯৩ রানে গুটিয়ে যাওয়া, আরেকবার ৪৩১ রান তোলা অস্ট্রেলিয়া। সেই উইকেটকে সরাসরি ‘ফ্ল্যাট’ বলেছিল, দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। আবহাওয়াও ভূমিকা রাখতে পারে। ডারউইনে সাধারণত দিনের তাপমাত্রা থাকত ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রির মধ্যে, সেখানে ম্যাকয়ে ২২ থেকে ২৪ ডিগ্রির পাশাপাশি বৃষ্টির সম্ভাবনাও আছে। নাফিস বলেন, ‘সেখানে একটু ঠা-া পরিবেশ থাকবে। সত্যি বলতে, খুব ভালো হয়েছে যে, খেলাটা চার দিনে শেষ হয়েছে। আগামীকাল (আজ) আমাদের খুব ব্যস্ত ভ্রমণসূচি আছে। সকালে সড়কপথে বের হব এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টার ভ্রমণ। উইকেট নিয়ে কোনো ধারণা পাইনি। নিজেরা গিয়ে বুঝে নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে। নতুন বলে পেসাররা সুবিধা দিতে পারেন। শেষ দিকে ভাঙা পিচে অস্ত্র হতে পারে মিরাজ-তাইজুলের স্পিন।

অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ম্যাচ জেতাটা শুধু সিরিজ বাঁচানোর নয়, দলের ভেতরকার চাপা উদ্বেগ কমানোরও প্রশ্ন। কিন্তু ম্যাকায়ে যা-ই ঘটুক, ডারউইনের জয় ইতিহাসেই খোদাই হয়ে থাকবে। এই জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের মূল স্রোতে টেনে আনার প্রশ্ন সামনে এনেছে। লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ১৭ বছর ইংল্যান্ডে টেস্ট খেলেনি। ভারতের মাটিতে খেলতেও অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৪ বছর। ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে বিকশিত হতে চাইলে সম্ভাবনাময় দেশগুলোকে সময় ও সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে, সুযোগ পেলে তারা কী করতে পারে। এখন ম্যাকায়ে সিরিজ জিতে সেই বার্তাকে পূর্ণতা দেওয়ার পালা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত