টাইগারদের অজি বধ

ডারউইনে বাংলাদেশের বীরত্বগাথা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৫ এএম

গল্পটা থেমে যাওয়ার নয়। বর্ণিল প্রেক্ষাপট, নন্দিত অধ্যায়, অসামান্য অর্জন, খ্যাতিমান সাবেক টেস্ট অধিনায়ক এবং ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম ধারাভাষ্যকার অস্ট্রেলিয়ার  অলরাউন্ডার রিচার্ড রিচি বেনোর প্রায় দু’দশক আগের কটাক্ষের যথার্থ জবাব; সব মিলিয়ে দীর্ঘ উপাখ্যান। বিগত প্রায় দুই যুগের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ঐতিহাসিক এই জয় আমাদের গর্বের নব অধ্যায়। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা অর্জন। আমরা প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সব লড়াকু যোদ্ধাকে।

‘টিম ওয়ার্ক’ এই শব্দ যুগল ক্রিকেটে খুব প্রচলিত বটে, তবুও অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে তানজীদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি ও হাসান মাহমুদ-মেহেদী হাসান মিরাজের বোলিং উল্লেখযোগ্য। অনুশীলন কীভাবে পরিশীলিত করে এর বিস্তর নজির আছে আমাদের সামনে। স্মরণে আছে, শিষ্টাচারের নীতিসূত্র মাড়িয়ে রিচি বেনো বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে টেস্ট থেকে ছেঁটে ফেলা উচিত’। কম যাননি অন্যতম সেরা ও কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ার লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নও। তিনি  আরও এক কদম এগিয়ে বলেছিলেন, ‘এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সহজে সেঞ্চুরি আর উইকেটের পাহাড় গড়ে টেস্ট ক্রিকেটের মূল ইতিহাস ও পরিসংখ্যানকেই বিকৃত করা হচ্ছে’। বরেণ্য এই ক্রিকেটারদের ওই বিদ্রƒপের  জবাব তাদের জন্য কোনো একদিন হতে পারে চরম নির্মম, তা তাদের বোধে ছিল না। ডারউইনের মারারার  ক্রিকেট-পিচে, বাউন্ডারি লাইন-বৃত্তে টাইগাররা ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং তিনটি পর্যায়েই যে ক্রিকেটীয় নান্দনিকতা দৃশ্যমান করেছে, নতুন করে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ বিশ্ব টেস্টের শক্তিশালী  দল অস্ট্রেলিয়াকে এভাবে বিধ্বস্ত করবে, তা অনেকের কাছে বিস্ময় হলেও এটাই তো এখন বাস্তবতা।

 ২০০৩ থেকে ২০২৬ মধ্যে ২৩ বছর। সময়ের বিস্তর ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম ধাপ থেকেই বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশের দৃশ্যমান চিত্র দেশে-বিদেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের শিহরিত করছিল। আর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের নীতিনির্ধারকদের কপালে দুর্ভাবনার ভাঁজ ক্রমেই হচ্ছিল পুরু। স্বাগতিকদের বিধ্বস্তের পর তাদের  নির্বাচক, নির্বাচন ও নীতি নিয়ে বিষোদগার করেছেন দেশটির বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং। বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের কর্তাদের ফেলেছে বহুমাত্রিক প্রশ্নের মুখেও। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কয় দিন টিকতে পারবে বাংলাদেশ, সিরিজ শুরুর প্রাক্কালে ক্রিকেটাঙ্গনে এমন আলোচনা, প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটারদের বিবর্ণ পারফরম্যান্স সবমিলে কঠিন চাপেই ছিল নাজমুল হোসেন শান্ত বাহিনী। সেই চাপ সামলিয়ে পরিশীলিত ক্রিকেট খেলে ইতিহাস গড়ে সব আলোচনা-পর্যালোচনার জবাব দিল টাইগাররা। আমরা জানি, আত্মবিশ্বাস যেকোনো ক্ষেত্রে প্রত্যয়ের ভিত মজবুত করে; আর সেই প্রত্যয়ের মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার সড়ক হয় চওড়া ও মসৃণ। বাংলাদেশ তা-ই দেখিয়ে দিয়েছে। টসে হেরে ডারউইনের গতি ও বাউন্স জেনেও শঙ্কা তাড়িয়ে নিজেদের মানসিক শক্তি পুষ্ট করে ও কৌশলের ছকে নিজেদের পরিণত করেন আমাদের পেসাররা। হাসান মাহমুদের ক্রিকেটীয় ব্যাকরণের সূত্রের নিখুঁত প্রয়োগে তোপে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার টপ-অর্ডার। একাই ৫৫ রানে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে ধসিয়ে দেন হাসান। বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেন তাসকিন-হাসানদের বল মারারার পিচে পড়ছিল যেন স্ফুলিঙ্গের মতো। ফিল্ডাররা সতর্ক প্রহরীর মতো নিয়ন্ত্রণ করেছেন ব্যাটারের ঠেলে দেওয়া বলের গতি। ব্যাটিং পর্বে বাংলাদেশের ব্যাটাররা প্রদর্শন করলেন শৈল্পিক ছন্দ, যা পরিপক্ব চিন্তা-স্থিরতা-সংযম-ধৈর্যের আরেক অধ্যায়।

প্রথম ইনিংসে পাহাড়সম ৪২৬ রান। বাংলাদেশ ২২৮ রানের লিড স্থির করে, যে লিড সমীকরণের নতুন খতিয়ান খুলে দেয়। এর পরের ধাপগুলো সমীকরণ নিয়ে আসে এক বিন্দুতে। বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্টের গাণিতিক হিসাবে ভারতকে পেছনে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিল, এ ক্ষেত্রেও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে হিসাবতুল্য। ডারউইন টেস্টের ফয়সালা বাংলাদেশ করেছে সাড়ে তিন দিনে। এখন পর্যন্ত যেকোনো ফরম্যাটে এটিই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে প্রথম এই ঐতিহাসিক জয় আমাদের ক্রিকেটারদের  অন্যরকম অনুপ্রেরণা জোগাবে, উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে। টেস্ট ক্রিকেটে অবিস্মরণীয় এক বীরত্বগাথা লিখেছে বাংলাদেশ। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হোক লক্ষ্য। অর্জনের খতিয়ান হতে থাক দীর্ঘ।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত