জসিম পাগলা
ভাটি অঞ্চলের বাউল জসিম পাগলা। নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার কুতুবপুর গ্রামের এই শিল্পী বাবার হাত ধরে গানে এসে দীর্ঘদিন ধরে করে যাচ্ছেন লোকসংগীতের চর্চা। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। সুফি ধারা, লোকজ পালাগান ও নিজের সৃষ্টি দিয়ে জয় করছেন গানপাগল মানুষের হৃদয়। গতকাল এসেছিলেন দেশ রূপান্তর কার্যালয়ে। গান নিয়ে আগামীর পরিকল্পনা ও বাউলজীবন নিয়ে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ
আপনার গানের জগতে আসা হয় কীভাবে?
গান-বাজনা আমার ঘরোয়া পরিবেশ থেকেই শুরু। মূলত আমার বাবা আবুল হাশেম বয়াতি পালাগান করতেন। ছোটবেলা থেকে বাবার মুখে গান শুনতে শুনতেই আমার সুরের জগতে পথচলা।
প্রধানত কোন ধারার গান করেন?
আমি লোকজ ও ফোক ধারার গান করি। বিচ্ছেদ কিংবা যেকোনো নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক গানের ওপর নিজে কথা বসিয়ে, সুর করে গাইতে পারি। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ পালাগান ও নানা লোককাহিনির কিচ্ছা গাইতে পছন্দ করি।
নিজের লেখা গানের সংখ্যা কত?
এ পর্যন্ত প্রায় দেড়-দুইশর মতো গান লিখেছি। নিজের লেখা গানই বেশি গাওয়া হয়। তবে শাহ আবদুল করিম ও আমাদের এলাকার সালাম সরকারের গানও গেয়ে থাকি।
যারা বাউল গান করেন, তাদের বাড়িতেও একটা আসর জমে ওঠে। নিশ্চয়ই আপনার বাড়িতেও গান-বাজনা নিয়মিত হয়?
১৯৯৭ সালে আমার নিজ বাড়িতে হযরত শাহ গাজী কালু জিন্দা পীরের দরবার শরিফ প্রতিষ্ঠা করি। প্রতি বছর মাঘ মাসের ২১, ২২ ও ২৩ তারিখে বাৎসরিক ওরস পালন করা হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি ভক্ত ও সাধারণ মানুষের সমাগম হয়। এছাড়া প্রায়ই আমার বাড়িতে গানের আসর করে থাকি। এখানে আমার ভক্ত যারা আছেন তারা গান শুনে থাকেন।
এই দরবার শরিফ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য?
ব্যক্তিগতভাবে বহুতল ভবন বানানোর ইচ্ছা আমার নেই। আমার স্বপ্ন, দরবার শরিফের মাধ্যমে এতিম, দুস্থ ও সাধু-সন্ন্যাসীদের সেবা করা। আল্লাহ যা রিজিক দেন, তা দিয়েই এদের পাশে দাঁড়াতে চাই।
বর্তমানের বাউল গানের পরিবেশ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আগের মতো খাঁটি বাউল পরিবেশ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কিছু মানহীন পরিবেশনা ও অর্থের লোভে পড়ে মূল সুফি ধারা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ নষ্ট করা হচ্ছে। তবে সৌভাগ্যবশত আমাদের নেত্রকোনা অঞ্চলে বাউল সংস্কৃতির ভাবমূর্তি এখনো সুন্দর ও সুরক্ষিত আছে।
সম্প্রতি টেলিভিশনে আপনি প্রোগ্রাম করলেন। নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় এসে কেমন লাগছে?
দীর্ঘ ২৬ বছর পর গত ২১ জুন ২০২৬ সালে চ্যানেল আইয়ের ‘চেনামুখ দুঃখ সুখ’ অনুষ্ঠানে গাওয়ার মাধ্যমে বড় ধরনের সাড়া পাই। এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই বস ফেরদৌস ওয়াহিদকে। ১৯৯৯ সালে আমার এক দূর সম্পর্কের চাচার মাধ্যমে বসের (ফেরদৌস ওয়াহিদ) সঙ্গে পরিচয়। তিনি বাউল ধাঁচের একজন তরুণ শিল্পী খুঁজছিলেন। এরপর উনার সান্নিধ্যে আসি এবং উনি আমাকে ছোটদের জন্য শিক্ষামূলক গান ‘শোনো আমার ছোট্ট বন্ধুরা’ গাওয়ান ও বিটিভির নানা অনুষ্ঠানে যুক্ত করেন। উনাকে আমি গুরুর আসনে বসিয়েছি। পরবর্তী সময়ে ১৬ আগস্ট ‘তারকা কথন’ অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। এসব অনুষ্ঠানে গাওয়ার পর আড়ং স্পন্সরশিপে ১৬টি প্রোগ্রাম উপহার দিয়েছে আমাকে। এগুলো নিয়মিত করা হবে।
ভবিষ্য পরিকল্পনার কথা জানতে চাই?
লোকশিল্পকে বুকে ধারণ করে আমৃত্যু সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়াই আমার একমাত্র লক্ষ্য।