ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি

অভিবাসনের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্ন না হয়

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ এএম

ভূমধ্যসাগরে ফের যে মর্মস্পর্শী অধ্যায় দুঃসহ স্মারক হয়ে দাঁড়াল, এর পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো জিজ্ঞাসা নতুন করে সামনে এলো। অভিবাসনের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে ভূমধ্যসাগরে কিংবা কোনো কোনো দেশের মরুপথে-জঙ্গলে যে বা যারা প্রাণ সংহারের পথ  করে নিজেদের উদর ভরেছে তাদের কজনকে আইনের আওতায় এনে প্রতিবিধান নিশ্চিত করা গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর যেমন প্রীতিকর নয়, তেমনি দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতাও সীমাহীন। ১৮ আগস্ট দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাবার ও পানি ছাড়া ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসগামী একটি নৌকায় যে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এর মধ্যে ১০ জনই বাংলাদেশি। জীবিত উদ্ধারকৃত ৩১ জনের মধ্যেও ২৯ জনই বাংলাদেশি। অবৈধভাবে উন্নত জীবনের গগনস্পর্শী প্রত্যাশায়  যাদের গ্রিস যাওয়ার ‘স্বপ্ন’ দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো এর দায় নেবে কে? আমরা জানি, এ নিয়ে এ পর্যন্ত কথা হয়েছে বিস্তর, কিন্তু তা যে অন্তঃসারশূন্য এরই ফের মর্মন্তুদ সাক্ষ্য মিলল।

ক্যাথলিক চার্চের প্রধান, রোমের বিশপ পোপ ফ্রান্সিস বলেছিলেন, ‘অভিবাসন কোনো সমস্যা নয়, যা সমাধান করতে হবে; এটি একটি মানবিক বাস্তবতা এবং মানব ইতিহাসের একটি অংশ’। কিন্তু  অনভিপ্রেত হলেও এটাই বিদ্যমান বাস্তবতা হয়ে সামনে এসেছে যে, কতিপয় ‘আদম ব্যাপারী’ আমাদের সমাজে প্রলোভনের জালে জড়িয়ে নিরাপদ অভিবাসন কঠিন সংকটের বিষয় করে তুলেছে। মানবিক বাস্তবতা নির্বাসন দিয়ে যাদের আখের গোছানোর আগ্রাসী থাবা নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের অস্পর্শিত রেখে এই মানবিক সংকটের সুরাহা কঠিন। তবে এটি একটি মাত্র পথ, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে আরও বহু পথ মারাতে হবে এবং তা করতে হতে হবে সরকারকেই। নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের পথ প্রশস্ত করতে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি অভিবাসীদের সুরক্ষা জোরদার এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মশক্তিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন। আমরা তার সঙ্গে সহমত পোষণ করি, কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও রাখি, দেশের যে চক্র বিভিন্ন দেশের মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে মিলে মানুষ নিয়ে ‘বাণিজ্যে’র ক্ষেত্র উর্বর করেছে তাদের ব্যাপারে সরকার কী ভাবছে?

যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপ ও মধ্যেপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কারাগারে ও আন্তর্জাতিক ‘আদম ব্যাপারী’দের মুঠোবন্দি রয়েছেন  অনেকে। প্রবাস থেকে দেশীয় চক্রের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি মুক্তিপণের দাবির খবরও ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম উঠে আসেনি। কিন্তু জিজ্ঞাসা হচ্ছে, এসব বিষয়ে আমাদের দূতাবাসগুলো ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা কী? অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার হার ক্রমেই বাড়ছে। উন্নত জীবনের অতিরিক্ত আশা, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব, সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয়তা, শ্রমবাজারের পরিসর কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়া ইত্যাদি অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব হয়ে উঠেছে বহুমুখী। ভূমধ্যসাগরসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক পথে  প্রাণহানি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ  হওয়া, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ ও কোটা কমে যাওয়া, গন্তব্য দেশগুলোতে কঠোর আইন ও প্রত্যাবাসনের মুখে পড়ার বিরূপ প্রভাব বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কঠোর সমঝোতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটনে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে দেশের ভেতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কারিগরি শিক্ষা প্রসার ঘটানোও জরুরি।

অবৈধ পথে কর্মী যাওয়ার কারণে অনেক দেশই বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের কর্তব্য বৈধ পথে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পথ সুগম করা এবং মানব পাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যাতে কেউ বের না হতে পারে, তা-ও নিশ্চিত করা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখছি, একটি সাফল্য গাঁথা যেমন অনেক  মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, তেমনি একটি অসফল অভিবাসন, এমনকি মৃত্যুও অনেককেই নিরুৎসাহিত করে না। শুধু আর্থ-সামাজিক কারণেই নয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেও কর্মহীন জনগোষ্ঠী জীবিকার সন্ধানে জীবনঝুঁকি নিচ্ছে। বিদ্যমান সংকটের সমাধানে এ বিষয়গুলোর গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। অভিবাসনের স্বপ্ন মানুষ দেখবেই। কিন্তু এই অভিবাসন যাতে নিয়মনীতির ভেতরে হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সব পক্ষেরই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত