গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জের পুরনো স্টেডিয়ামে ব্যান্ড দল অ্যাশেজ, শিল্পী নোবেল ও জুনায়েদের অংশগ্রহণে কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতিও ছিল শেষ পর্যায়ে। প্রিয় শিল্পীদের গান শুনতে নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেডিয়ামে জড়ো হতে থাকেন দর্শক। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে জেলা প্রশাসন অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসন জানায়, ইমাম-উলামা পরিষদ কনসার্টের বিরোধিতা করে বন্ধের আবেদন করেছে। যদিও আয়োজকের নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিষয় দেখিয়ে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। এতে দর্শকের দীর্ঘ অপেক্ষা ও প্রস্তুতি শেষ মুহূর্ত হতাশায় পরিণত হয়।
এর ঠিক এক দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে চলছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঞ্চে শিল্পীরা অনুষ্ঠান মাতিয়ে তুলেছেন। প্রিয় শিল্পীর সঙ্গে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে কেউ গাইছিলেন, কেউ আবার মুঠোফোনে ধরে রাখছিলেন সেই আনন্দের মুহূর্ত। চারপাশে ছিল উৎসবের আমেজ। হঠাৎ পাশের দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজানোর আপত্তি তোলেন। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক, হামলা ও সংঘর্ষে অনুষ্ঠান প- হয়ে যায়। গান-আনন্দের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয় উত্তেজনা ও আতঙ্কে। এর মাত্র কিছু দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
শুধু এই দুটি ঘটনা নয়; সম্প্রতি এ রকম অনুষ্ঠান চলাকালীন কিংবা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে নানা ইস্যু তুলে বাধা, হামলা ও বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা যেন নিয়মিত হয়ে উঠছে। স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী,
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নৌকাবাইচ, লোকগান ও লোকনাট্যও বন্ধ কিংবা হামলার শিকার হচ্ছে। ইসলামি মূল্যবোধবিরোধী আখ্যা দিয়ে কখনো ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে, কখনো ‘ইমাম-উলামা পরিষদ’-এর নামে, আবার কখনো কোনো ব্যানার ছাড়াই সাধারণ কিংবা সচেতন মানুষের কথা বলে অনুষ্ঠান প- করে দেওয়া হচ্ছে।
গত দুই বছর ধরে চলা এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কিংবা কনসার্ট-সর্বত্রই এক ধরনের ‘মবভীতি’ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যখন মবের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে, তখন সমাজে বার্তা যায় আইনের চেয়ে পেশি শক্তি ও হুমকিই শেষ কথা। এ প্রবণতা ঠেকাতে কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে তাদের প্রশ্ন এসব কি বিচ্ছিন্ন স্থানীয় আপত্তি? নাকি সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত করার বৃহত্তর কোনো ষড়যন্ত্র? সরকার
সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আদৌ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পরিসর হিসেবে দেখছে কি না। গোষ্ঠী বিশেষের আগ্রাসী তৎপরতা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে কি না?
এ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘কনসার্ট বাতিল মানেই সরকার সহযোগিতা করল না, তা নয়। হয়তো নিরাপত্তা ইস্যু ছিল। বাংলাদেশে অনেক কনসার্ট হচ্ছে। বড় বড় কনসার্ট হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের তরফ থেকে এ ধরনের মানসিকতা নেই যে কালচারাল কোনো ব্যাপারে বাধাবিঘœ হয় এমন কিছু। এ ধরনের চিন্তা শেয়ার করি না।’
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমরা একমত সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের ঘটনা যত ঘটেছে, তার তুলনায় কিছুই হচ্ছে না এখন। অ্যাম আই রং? আমি যদি তুলনা করি, ৫ আগস্টের পরবর্তী বাংলাদেশ যে জায়গায় চলে গিয়েছিল, এ সরকারের সময় সিগনিফিকেন্টলি বললে কম বলা হবে, ড্রামাটিক্যালি ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। তবে দুয়েকটি ঘটনা যে ঘটছে না, তা নয়।’ গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডের তথ্য জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এ কথাগুলো বলেন।
অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। এমন নয় সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বাধা আসছে। ছোটখাটো এসব ঘটনা আগেও ছিল। এ ধরনের অনুষ্ঠান নির্বিঘেœ করতে আমাদের যথেষ্ট প্রচেষ্টা রয়েছে। যারা বাধা দিচ্ছে, তাদের প্রতিহত করতে সরকারও অত্যন্ত সজাগ। তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। আমাদের দেশে ধর্মীয় উৎসব ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় পুলিশেরও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল বলে জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ বলেন, ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেন ঘটনাটি ঘটল, কোনো পক্ষের গাফলতি ছিল কি না তা তদন্তে উঠে আসার পর মন্তব্য করা যাবে। আর কিশোরগঞ্জে কনসার্ট শুরুর আগেই বাতিল করার বিষয়ে পুলিশ বলছে এটা জেলা প্রশাসকের বিষয়। তবে জেলা প্রশাসনের কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কমছে সাংস্কৃতিক আয়োজন : কনসার্ট, লোকগান, যাত্রাপালা, গানের আসর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা, হামলার, হুমকির কারণে সাম্প্রতিককালে এসব আয়োজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তবে ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারও লাইভ সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ারও একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন কেউ কেউ। উদাহরণ হিসেবে যাত্রাপালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার হিসাব থেকে গ্রামীণ আয়োজন সংকুচিত হওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে দুর্গাপূজা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রাপালা প্রদর্শনীর আয়োজন হতো। তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পকলা একাডেমিতে নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা ২০৫টি। কিন্তু এখন কোনো রকমে ঠিকে আছে ৪০ থেকে ৫০টি দল। তারাও কোনো প্রদর্শনী করতে পারছে না।
বাউলশিল্পী আরিফ দেওয়ান বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় লোকসংস্কৃতির চর্চায় এ ধরনের বাধা ছিল না। তবে সম্প্রতি মাজারে হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আক্রমণসহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি সংঘর্ষমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা লোকসংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলেছে। উগ্রবাদী ও সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী এ কাজগুলো করছে।
পুলিশের একটি শাখার হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে শুধু তৌহিদী জনতার ব্যানারেই অন্তত ১৩টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে এনে বাধার মুখে পড়েছে ৩৯টি আয়োজন। এর বাইরে নাটক মঞ্চায়িত করাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, বাউলগানের অনুষ্ঠানে বাধাদান ও শহীদ মিনার ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
কারা, কেন বাধা দিচ্ছে : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কখনো অশ্লীলতা প্রচার ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তোলা হচ্ছে, আবার কখনো স্থানীয় প্রশাসন সমস্যা সমাধান করে অনুষ্ঠান চালু রাখার বদলে তা বন্ধ করে দিচ্ছে।
যেমন গত বছরের এপ্রিলে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর মহিলা সমিতি মিলনায়তনে নাট্যদল প্রাঙ্গণেমোরের ‘শেষের কবিতা’ নাটকের প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতি শেষে মঞ্চে ওঠার অপেক্ষায় থাকা নাট্যকর্মীরা ‘তৌহিদী জনতার’ হুমকির চিঠি পেয়ে প্রদর্শনী বাতিল করেন। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগ তুলে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে বিক্ষোভ ও একটি ফুলের দোকানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে উদীচীর বসন্তবরণ অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। ২৮ জানুয়ারি দিনাজপুরের হিলিতে নারী ফুটবল খেলার বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষে টুর্নামেন্ট ভ-ুল হয়। ওই ঘটনাতেও ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানার ব্যবহার করা হয়েছিল। সর্বশেষ সিলেটের বিয়ানীবাজারের সুনাই নদীতে নৌকাবাইচের আগেই ‘তৌহিদী জনতা’ তা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করে। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলেও আগামী বছর থেকে এটি না করার শর্তে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন লাউতা ইউপি চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন। এই নৌকাবাইচ বন্ধের অজুহাত হিসেবে প্রথমে জুয়া, তারপর নদীভাঙন, তারপর ফসলহানির কথা বলা হলেও দুই ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব কোনো কিছুরই অস্থিত্ব পায়নি বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সমালোচনা করে অনেকেই বলেন, এতদিন গান-বাজনা নিয়ে আপত্তি করা হলেও নৌকাবাইচের মতো বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নির্মল আনন্দের খেলা আয়োজন বন্ধে আপত্তির কারণ কী হতে পারে? এর পেছনে ধর্মীয় মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করার পাঁয়তারা কি না, খতিয়ে দেখা দরকার।
এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুণ বলেন, ইচ্ছামতো সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কাজ বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা সরকারকে আইনিভাবে বন্ধ করতে হবে। সরকার যদি নিজেদের সংস্কৃতিবান্ধব হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, তবে যার যা খুশি বন্ধ করে দেওয়ার এই অপসংস্কৃতি আইনের মাধ্যমে থামাতে হবে।
কারা ‘তৌহিদি জনতা’ : সাধারণ অর্থে ‘তৌহিদী জনতা’ বলতে একত্ববাদে বিশ্বাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হলেও বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নির্দিষ্ট কোনো সাংগঠনিক নেতৃত্ব ছাড়াই বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের এ নামে পরিচয় দিচ্ছে। মাজার ভাঙচুর, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা কিংবা নারীদের অংশগ্রহণ ঠেকানোর মতো ঘটনায়ও এ পরিচয় ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এসব তৎপরতা বেড়ে যায়। এ সময় ৯৮টি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ হত্যা, লাশ পুড়িয়ে দেওয়া এবং কবর থেকে মরদেহ তুলে পোড়ানোর মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটে। ফলে নির্বাচিত সরকার এলে ধর্মের নামে বিশেষ গোষ্ঠীর এমন মব তৎপরতা বন্ধ হবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়েও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
এ ধরনের হামলা, বাধা সৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক আসর সংকুচিত হচ্ছে কী? এমনটি জানতে চাওয়া হয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের কাছে। উত্তরে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিঃসন্দেহে প্রভাব পড়ছে। আমরা একটা দুর্ভাগা জাতি। অনেক দিন ধরে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেতিবাচক কর্মকা- শুরু হয়েছে। অথচ এ ধরনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় থাকে, যেখান থেকে শেখা যায়। আমরা এসব বিবেচনায় নিয়েছি, এর মধ্য থেকেই কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে বের করে আনার চেষ্টা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব কারা করছে, তা সবাই জানে। শুধু রাষ্ট্র নয়; সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভাবতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানীর মতে, তৌহিদী জনতা বলতে আপাময় মুসলিম জনসমষ্টিকে বুঝায়। সম্প্রতি তৌহিদী জনতার ব্যানারে যারা অতিউৎসাহী হয়ে হামলা-ভাঙচুর করছে, তাদের কোনো পরিচয় নাই। কোনো সংগঠন, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের ব্যানারে বাধা-হামলা করলে কেউ এতে অংশগ্রহণ করবে, কেউ হয়তো করবে না। তাই তৌহিদী জনতার ব্যানারে করলে আপাময় জনসাধারণ সঙ্গে থাকবে, সেই লক্ষ্য থেকেই একটি গোষ্ঠী এই ব্যানারে এসব করে বেড়াচ্ছে।
সংস্কৃতির মঞ্চে রাজনীতির ছায়া : দুই মাসের অপেক্ষা। প্রিয় শিল্পী অনুপম রায়ের গান সরাসরি শুনতে আগেই টিকিট কেটেছিলেন অনেক ভক্ত। কেউ ঢাকার বাইরে থেকে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কনসার্ট ঘিরে সাজিয়েছিলেন দিনটি। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাত্র দুই দিন আগে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে বাতিল করা হয় অনুমতি। ভেস্তে যায় দর্শকের অপেক্ষা, আর বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। গত ২৯ জুলাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নোটিসে বাতিল হয় ১ আগস্টের ‘ওয়ান ট্রু কনসার্ট’। এর আগে ২৬ জুনের অনুষ্ঠানও বাতিল হয়েছিল। পরে ২০ জুলাই অনুমতি পেয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটিও বাতিল হয়। ফলে দুই দফায় ঢাকায় বাতিল হলো অনুপম রায়ের কনসার্ট। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তানি শিল্পী আতিফ আসলামের কনসার্ট নির্বিঘেœ হওয়ার পর অনুপম রায়ের অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে’। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পরিসর হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো চেষ্টা আছে কিনা, সে আলোচনা হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো অনুষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া না দেওয়ার বিষয় না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, এমনটি সামনে আসার পর অনুপম রায়ের কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে। তখনি বাতিল না করলে পরবর্তীতে কোনো কিছু ঘটলে এর দায়ভার আমাদের ওপর আসত। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই।
ধর্মীয় নেতারা যা বলেন : বাধা ও হামলার বিষয়ে কয়েকজন ধর্মীয় নেতার মতামত নেওয়া হয়। তাদের বক্তব্যেও মতপার্থক্য লক্ষ্য করা গেলেও কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার কথা বলেছেন প্রায় সবাই।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী বলেন, ‘এ ধরনের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আইনগত বিষয় রয়েছে। আইনের অধীনে চলে আসলে আইনকে অনুসরণ করতে হবে।’
হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান-বাজনা, এ ধরনের অনুষ্ঠান করায় সাধারণ জনগণ ও তৌহিদী জনতার নামে ইমানি দায়িত্ব থেকে এসবের প্রতিবাদ করা হয়। কিন্তু আইন হাতে তুলে নেওয়া কিংবা শক্তি প্রদর্শন করা কাম্য নয়। প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অতি উৎসাহী বা আবেগী হয়ে হামলা-ভাঙচুর করাও শরিয়া ও আইনবিরোধী।
ঢাকার তাকওয়া মসজিদের ইমাম ও ইসলামিক প-িত মুফতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ইসলাম কোনোভাবেই এ ধরনের হামলা সমর্থন করে না। যেকোনো অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের কাছে যাওয়া যেতে পারে, তবে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে হামলা চালানো অবৈধ।