নিখোঁজ পাঁচ জেলে বেঁচে নেই, আশঙ্কা পরিবারের

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

বৈরী আবহাওয়ায় বরগুনায় বঙ্গোপসাগরের হাইরের চরসংলগ্ন এলাকায় ১৩ জেলেসহ একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে গেছে। এর মধ্যে আটজন জীবিত উদ্ধার হলেও পাঁচজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের পরিবারের আশঙ্কা, তারা সবাই ট্রলারের মধ্যে আটকা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি ট্রলার মালিক সমিতি কিংবা কোস্ট গার্ড। এদিকে বঙ্গোপসাগরে নিউজিল্যান্ডের এক পরিবারের চার সদস্যসহ একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও এক কিশোর নিখোঁজ রয়েছে।

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, গত সোমবার দুপুরের পর মাছ ধরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এফবি বরকত ট্রলারের জেলেরা। হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় তাদের ট্রলারটি। এ সময় ট্রলারের ব্রিজের মধ্যে ঘুমাচ্ছিলেন সাত জেলে। তাদের মধ্যে দুজন বের হতে পারলেও পাঁচজন বের হতে পারেননি। ট্রলার মালিক ও পরিবারের দাবি, নিখোঁজ পাঁচ জেলেই মারা গেছেন। তাদের লাশ উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এ ঘটনায় জেলেদের পরিবারগুলোতে বইছে শোকের মাতম। নিখোঁজ জেলেরা হলেন পাথরঘাটা উপজেলা সদর ইউনিয়নের মোস্তফার ছেলে কাওসার, ইদ্রিসের ছেলে বেল্লাল, চুন্নু মাঝির ছেলে ইব্রাহিম, জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে নুর আলম ও শাহাদাত মাঝির ছেলে সাইকুল ইসলাম।

ট্রলার মালিক বাদল মোল্লার বরাতে স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মোল্লা জানান, ‘বাদল মোল্লা আমাকে সকালে কল দিয়ে জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহ নিয়ে সমুদ্র থেকে রওনা হয়েছেন। তবে বিকেলে তিনি আবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবশেষ তিনি জানতে পেরেছেন বিকেল ৪টার দিকে উদ্ধারকারী ট্রলারটি ডুবে যাওয়া ট্রলারের কাছে পৌঁছেছে এবং একজনের লাশ দেখতে পেয়েছে। তবে লাশটি কার সেটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।’ এই ট্রলারে মাছ শিকারে গিয়েছিলেন পাথরঘাটার হাড়িটানা গ্রামের মো. কাওসার। কাওসারের পরিবারের দাবি, তাদের সন্তান আর বেঁচে নেই। কাওসারের চাচা হারুন জানান, ট্রলার মালিক তাদের ফোনে জানিয়েছেন কাওসারের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এরপর থেকে তাকেও আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে ফিরে আসা জেলেদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। তারা জানান, সাগরে যখন ঝড় শুরু হয় তখন ঘুমন্ত অবস্থায় ট্রলারের ব্রিজের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন সাতজন জেলে। বাকিরা বাইরে ছিলেন। ট্রলারটি যখন ডুবে যায় তখন দুজন বের হতে পারলেও বাকিরা আটকা পড়েন ব্রিজের মধ্যেই। তারা বের না হতে পারলে কারোই বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ফিরে আসা জেলে মনোমথ বলেন, আমিও ব্রিজের মধ্যে ঘুমিয়েছিলাম। পানি ঢুকে যখন তলিয়ে গেল তখন কোনোভাবে বের হতে সক্ষম হই। ওপরে উঠে দুই ঘণ্টা সাঁতরে আরেকটি ট্রলারের নাগাল পেলে তারা উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে আসে।   জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী সকালে বলেন, জেলেদের উদ্ধারে যাওয়া ট্রলার দুটির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে। জেলেদের লাশ উদ্ধারের খবর শোনা যাচ্ছে, তবে আমরা নিশ্চিত নই।

পাথরঘাটা ইউএনও তাপস পাল বলেন, মরদেহ পাওয়া গেছে, এমন খবর বিভিন্নজনের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য নেই। একই বক্তব্য পাথরঘাটা থানার ওসি মো. আব্দুল আলীমের। তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি আমরা যাচাই করতে পারিনি। এ বিষয়ে ভোলা কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা ও স্টেশন কমান্ডারের মুঠোফোনে কল করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

সাগরের মোহনায় নিউজিল্যান্ডের নাগরিক নিখোঁজ : কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে নিউজিল্যান্ডের এক পরিবারের চার সদস্যসহ ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এতে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও এক কিশোর নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরটেকসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর-বাঁকখালী নদীর মোহনায় এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ কিশোর জং নিউজিল্যান্ডের নাগরিক আলভার্টের প্রতিবন্ধী ছেলে। স্থানীয়রা জংয়ের বাবা-মা ও বড় ভাইকে উদ্ধার করেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক আলভার্ট প্রায় তিন বছর আগে কক্সবাজার জেলা কৃষক লীগের সভাপতি আতিক উদ্দিন চৌধুরীর এসএম পাড়াস্থ ডকে একটি ট্রলার বানাতে দেন। মাস ছয়েক আগে ট্রলার প্রস্তুত হলে তিনি ট্রলার নিয়ে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু ট্রলারটি সোনাদিয়ায় পৌঁছালে দস্যুতার কবলে পড়ে। এতে ট্রলারের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে আবার ট্রলারটি মেরামত করে সোমবার সকালে শহরের ৬ নম্বর জেটিঘাট থেকে পরিবারের চার সদস্যসহ নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি নাজিরার টেক মোহনায় টেউয়ের আঘাতে উল্টে যায়।

এ বিষয়ে জেলা যুবদল নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী দিদারুল ইসলাম রুবেল বলেন, সকালে ব্যবসায়িক কাজে আমিসহ কয়েকজন নাজিরার টেক আসি। তখন একটি ট্রলার ঢেউয়ের আঘাতে উল্টে যেতে দেখে দ্রুত আলবার্ট, তার স্ত্রী ও বড় ছেলেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হই। কিন্তু তার প্রতিবন্ধী শিশু ও ট্রলারটি ডুবে যায়। তাৎক্ষণিক আমি কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেই। পরে তারা আসে। এদিকে কোস্ট গার্ড অভিযান শেষ করার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে রাজি না হলেও খবর নিয়ে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া তিনজন বর্তমানে কোস্ট গার্ডের সেফ হাউজে রয়েছেন। ফায়ার সর্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের  কক্সবাজার স্টেশন ইনচার্জ দোলন আচার্য বলেন, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় জেলে ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে।

বিকল বোটসহ ১৬ জেলেকে উদ্ধার নৌবাহিনীর : গত সোমবার বঙ্গোপসাগরে টহল কার্যক্রম পরিচালনার সময় নৌবাহিনী জাহাজ ‘বানৌজা কপোতাক্ষ’ মোংলা ফেয়ারওয়ে বয়ের কাছ থেকে ভাসমান অবস্থায় মৎস্য বোট ‘এফবি আল আমিন’ এবং এর ১৬ জেলেকে উদ্ধার করেছে। এ সময় নৌবাহিনীর সদস্যরা জেলেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তারা গত ১৯ আগস্ট বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকা থেকে মৎস্য আহরণের সমুদ্রে গমন করে। কিন্তু দুই দিন পর বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে এবং গত তিন দিন ধরে সমুদ্রে ভাসতে থাকে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর এ তথ্য জানায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত